রমিত সরকার, কৃষ্ণনগর:
স্বামীকে হারিয়েছিলেন মাত্র ৩২ বছর বয়সে। সামনে তখন তিন সন্তান, সংসারে অনিশ্চয়তা, ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তা। কিন্তু পরিস্থিতির কাছে মাথা নত করেননি কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণির মায়া রানি পাল। কারও কাছে সাহায্যের হাত না পেতে নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন মাটি। সেই মাটিই হয়ে উঠেছিল তাঁর সংসার চালানোর প্রধান অবলম্বন। আজ ৮৩ বছর বয়সেও সেই মাটির সঙ্গেই তাঁর নিবিড় সম্পর্ক।
কৃষ্ণনগরের পুতুলপট্টিতে মায়া রানির বাবার বাড়ি। ছোটবেলা থেকেই মৃৎশিল্পের পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা। স্বামীর মৃত্যুর পর শৈশবের সেই পরিচিত কাজই নতুন করে আঁকড়ে ধরেন তিনি। মৃৎশিল্পী মুক্তি পাল ও শম্ভু পাল তাঁর কাজের শুরুর দিনগুলিতে বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। তাঁদের কাছ থেকেই কাজের প্রাথমিক ছাঁচ ও কৌশল শেখেন মায়া দেবী। আজও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাঁদের স্মরণ করেন তিনি।

একসময় মাটির প্রতিমা তৈরির চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু দু’বার প্রতিমা তৈরি করেও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে তা শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায়। মায়া রানির কথায়, “দু’বার প্রতিমা গড়েছিলাম, কিন্তু সেটা বোধহয় আমার ভাগ্যে ছিল না। দু’বারই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সব ভেঙে গেল।” এরপর প্রতিমা তৈরির কাজ ছেড়ে মন দেন মাটির ফলমূল ও শাকসবজি তৈরিতে।
পাকা আম, কাঁচা আম, আপেল, ডালিম, ন্যাশপাতি থেকে শুরু করে শসা, কলা, তাল, আলু, পটল, সিম—মাটির তৈরি তাঁর নানা সামগ্রী ধীরে ধীরে পরিচিতি পেতে থাকে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত তো বটেই, রাজ্যের বাইরেও পৌঁছতে শুরু করে তাঁর তৈরি সামগ্রী। এই কাজের আয়েই দুই ছেলে ও এক মেয়েকে মানুষ করেছেন তিনি। তাঁদের ঘর-সংসারও গড়ে দিয়েছেন নিজের হাতে।
মায়া দেবী জানান, মাটির ফলমূল ও শাকসবজি তৈরির কাজ এখন তিনি ভালোবেসেই করেন। এই শিল্পে এখন আগ্রহী মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। নির্দিষ্ট ছাঁচে মাটি দিয়ে প্রথমে তৈরি করা হয় বিভিন্ন ফল ও সবজির আকৃতি। এরপর সেগুলি ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়া হয়। পরে তেঁতুলবীজের আঠা রঙের সঙ্গে মিশিয়ে রং করা হয় এবং সবশেষে দেওয়া হয় বার্নিশের প্রলেপ।

বয়সের ভারে এখন আগের মতো কাজ করতে পারেন না মায়া দেবী। বাড়ির ছেলে ও পুত্রবধূরাই অনেকটা কাজ সামলে নেন। তবুও মাটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি।
মাত্র ৩২ বছর বয়সে যে মাটি এক অসহায় বিধবার হাতে উঠে এসেছিল, সেই মাটিই আজ ৮৩ বছরের মায়া রানি পালের পাঁচ দশকের সংগ্রাম, আত্মনির্ভরতা ও সৃষ্টিশীল জীবনের সাক্ষী। সংসারের দায়িত্ব থেকে শিল্পের প্রতি ভালোবাসা—সবকিছুকে সঙ্গে নিয়ে এখনও মাটি গড়ে চলেছেন তিনি।

Be the first to comment