নিজস্ব সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর:
দুর্গাপুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয়েছে কালীপুজোর প্রস্তুতি। আর তার পরেই নদিয়ার কৃষ্ণনগর মেতে উঠবে ঐতিহ্যবাহী জগদ্ধাত্রী পুজোয়। প্রতিবারের মতো এ বারও কয়েক দিন ধরে শহরের রাস্তায় নামবে হাজার হাজার মানুষের ঢল। তবে উৎসবের আনন্দের মাঝেই এ বার বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা। কলকাতার চোরবাগানে দুর্গাপুজোর সময় পদপিষ্টের ঘটনার পর কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোয় ভিড় সামলানোর প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের শহর কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এ শহরের ঐতিহ্য ও আবেগের সঙ্গেও জড়িয়ে। ভোররাত থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত দর্শনার্থীদের ভিড়ে সরগরম থাকে শহরের বিভিন্ন পুজোমণ্ডপ। অঞ্জলি দেওয়া থেকে প্রতিমা দর্শন, আবার বিসর্জনের শোভাযাত্রা— উৎসবের প্রতিটি পর্বেই মানুষের ঢল নামে রাস্তায়। ফলে কোথাও ভিড়ের চাপ বেড়ে গেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে চিন্তিত স্থানীয়দের একাংশ।

এই উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে চাষাপাড়া বুড়িমার পুজো। অন্য অনেক পুজোর মতো এখানে চোখধাঁধানো থিম বা জাঁকজমকপূর্ণ মণ্ডপসজ্জা নেই। বরং দেবীর অপরূপ রূপ, ঐতিহ্য এবং ভক্তদের বিশ্বাসই এই পুজোর প্রধান আকর্ষণ। মানত পূরণের পর ভক্তদের দেওয়া কেজি কেজি সোনার গয়নায় সজ্জিত হন বুড়িমা। সেই টানেই প্রতি বছর দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ ছুটে আসেন। ভোররাত থেকেই পুজো দেওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ান পুণ্যার্থীরা। কিন্তু সরু গলি ও সীমিত পরিসরের মধ্যে বিপুল মানুষের সমাগম হলে ভিড় নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
চোরবাগানের ঘটনার পর তাই প্রশ্ন উঠছে, বুড়িমার দর্শনে আসা ভক্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ বার কী বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে? প্রবেশ ও বেরোনোর পথ আলাদা রাখা, ব্যারিকেড বসানো, সিসিটিভি নজরদারি, পর্যাপ্ত পুলিশকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েনের মতো বিষয়গুলি কতটা গুরুত্ব পাবে, তা জানতে চাইছেন শহরবাসী। পাশাপাশি কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া এবং উদ্ধারকাজ চালানোর ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তাঁরা।

চাষাপাড়া বুড়িমা পুজো কমিটির সাধারণ সম্পাদক কেষ্ট পাল জানিয়েছেন, ভিড় নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনের নির্দেশ মেনেই কাজ করবেন তাঁরা। তাঁর কথায়, “কলকাতায় সদ্য একটা বিপর্যয় ঘটে গিয়েছে। তাই আমরা ব্যক্তিগত ভাবে কোনও রকম ঝুঁকি নিতে চাই না। গোটা বিষয়টি আমরা পুলিশ প্রশাসনের উপর ছেড়ে দিচ্ছি। তারা যে ভাবে নির্দেশ দেবে, আমরা পুজো কমিটি সে ভাবেই পালন করব।” অর্থাৎ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রশাসনের পরিকল্পনাকেই গুরুত্ব দিতে চাইছে বুড়িমা পুজো কমিটি।
তবে কৃষ্ণনগরের সমস্ত পুজোকে ঘিরে একই রকম উদ্বেগ নেই উদ্যোক্তাদের একাংশের মধ্যে। শহরের আর এক ঐতিহ্যবাহী কাঁঠালপোতা ছোটোমা পুজো কমিটির প্রাক্তন কর্তা দেবাশিস রায়ের মতে, কৃষ্ণনগরে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পুজো হওয়ার কারণে সব জায়গায় একসঙ্গে বিপুল ভিড় জমে না। তাঁর বক্তব্য, বুড়িমার পুজোতেই মূলত মানুষের চাপ বেশি থাকে। ছোটোমার মণ্ডপে পুলিশ এবং কমিটির স্বেচ্ছাসেবকেরা ভিড় সামলাতে পারেন। সেখানে সিসিটিভি নজরদারির ব্যবস্থাও রয়েছে। তাই তাঁর মতে, অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
এ দিকে, পুজোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসন ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সমন্বয় বৈঠকের দিন এখনও চূড়ান্ত হয়নি। কৃষ্ণনগর উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক তারকনাথ চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, পুলিশ ও পুজো কমিটিগুলিকে নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হবে। তিনি বলেন, “এ বার পুলিশকে বলব, প্রত্যেকটি এন্ট্রি ও এগজ়িট গেট যেন আগের তুলনায় বড় করা হয়। রাস্তা জুড়ে যে সমস্ত পুজো হয়, সেখানে যথাযথ চেকিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি প্রত্যেক বারোয়ারি পুজো উদ্যোক্তাদের আরও বেশি স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন করার জন্য বলব।”

শুধু মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় নয়, কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর বিসর্জনও নিরাপত্তার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য মেনে প্রতিমা বেহারাদের কাঁধে বাঁশের মাচা বা ‘সাঙ’-এ বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়। শহর ছেড়ে যাওয়ার আগে প্রতিমাগুলিকে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির নহবতখানা ছুঁয়ে জলঙ্গি নদীর কদমতলা ঘাটে পৌঁছতে হয়। ফলে বিভিন্ন পুজো কমিটির প্রতিমা একই পথে আসায় কোথাও কোথাও মুখোমুখি পরিস্থিতি তৈরি হয়। তার সঙ্গে থাকে দর্শনার্থীদের বিপুল ভিড়। ফলে বিসর্জনের শোভাযাত্রায় পথ নিয়ন্ত্রণ, প্রতিমা চলাচলের সময় সমন্বয় এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করাও প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার সুপার অতুল ভি জানিয়েছেন, জেলাশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে জগদ্ধাত্রী পুজোর উদ্যোক্তাদের নিয়ে সমন্বয় বৈঠকের আয়োজন করা হবে। সেই বৈঠকেই নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে, কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোয় এ বার উৎসবের প্রস্তুতির পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে জননিরাপত্তার প্রশ্নও। চোরবাগানের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে মণ্ডপে দর্শন, রাস্তায় যাতায়াত এবং বিসর্জনের শোভাযাত্রা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই আগাম পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক সমন্বয় কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর শহরবাসীর। ঐতিহ্যের টান ও ভক্তির আবেগ অটুট রেখেই যাতে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয় কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

Be the first to comment