নীল দুর্গার আরাধনা, দশমীর পর ঘটে কালীপুজো! ৩৫০ বছরের ঐতিহ্য আগলে কৃষ্ণনগরের বেজিখালির রায় পরিবার

Spread the love

রমিত সরকার, নদীয়া : 

ঐতিহ্য আর বিশ্বাসের মেলবন্ধনে আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল কৃষ্ণনগরের বেজিখালির রায়বাড়ির দুর্গাপুজো। তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পরিবার আগলে রেখেছে এক বিরল পুজোপ্রথা। যেখানে দেবী দুর্গার গায়ের রং নীল, মায়ের বেদিতে পূজিত হন শ্রীনারায়ণ শিলা, আর দশমীর পুজো শেষ হওয়ার পরেও ঘটে কালীপুজোর মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় দেবীর আরাধনা। প্রাচীন রীতি, পারিবারিক বিশ্বাস এবং তন্ত্রাচারের অনন্য সংমিশ্রণে রায়বাড়ির এই পুজো আজও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

বাড়ির সদস্যদের দাবি, প্রায় ৩৫০ বছর আগে অধুনা বাংলাদেশের কুড়ুলগাছি গ্রামে রায় পরিবারের পূর্বপুরুষ শ্রী কামাখ্যা প্রসাদ ব্যানার্জির হাত ধরে এই পুজোর সূচনা হয়। স্বপ্নে দেখা নীল দুর্গার রূপেই দেবীর আরাধনা শুরু করেছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে জমিদারের কাছ থেকে তাঁদের পরিবার ‘রায়’ উপাধি লাভ করে। সেই থেকেই তাঁরা রায়বংশ নামে পরিচিত।

পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে তাঁদের বাড়িতে দুর্গাদালান তৈরি করে নিয়মিত পুজো হত। দেশভাগের সময় দুর্গাদালান ভেঙে যাওয়ার পর মাটির নীচ থেকে উদ্ধার হয়েছিল কয়েক মণ ঠাকুরের বাসনপত্র। পরবর্তী সময়ে পারিবারিক ও আর্থিক নানা সমস্যার কারণে কয়েক বছর বন্ধ ছিল পুজো। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয় পরিবার। বর্তমানে কৃষ্ণনগরের বেজিখালিতে নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হচ্ছে সেই প্রাচীন আরাধনা।

তিন কল্পে দেবীর তিন রূপ, রায়বাড়িতে নীল দুর্গা

রায়বাড়ির পুজোর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য দেবীর নীলবর্ণ রূপ। পরিবারের সদস্য প্রীতম রায় জানান, তাঁদের বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবীর তিনটি কল্পের মধ্যে প্রথমটি উগ্রচণ্ডা কল্প, যেখানে দেবীর বর্ণ কালো। দ্বিতীয়টি ভদ্রকালী কল্প, যেখানে দেবী নীলবর্ণা। আর তৃতীয়টি কাত্যায়নী কল্প, যেখানে দেবীর রূপ সোনালি আভায় উজ্জ্বল। তাঁদের বাড়িতে ভদ্রকালী কল্পের নীলবর্ণা দেবীরই আরাধনা করা হয়।

এই পুজোর আর এক বিশেষত্ব হল, দেবী দুর্গার বেদিতে শ্রীনারায়ণ শিলা রেখে নারায়ণের আরাধনা। দুর্গা ও নারায়ণের যুগল আরাধনা রায়বাড়ির পুজোকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর পুজোয় ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয় খিচুড়ি, পায়েস, পোলাও, লুচি, সুজি, পাঁচ রকম ভাজা ও মিষ্টি।

অষ্টমীর সন্ধিপুজোয় রয়েছে বিশেষ রীতি। পরিবারের দাবি, এদিন ছাগবলির পর সেই মাংস তন্ত্রাচার মেনে মহাপ্রসাদ হিসেবে দেবীকে নিবেদন করা হয়। অন্যদিকে, দশমীর ভোগেও রয়েছে ব্যতিক্রমী ঐতিহ্য। পান্তা ভাত, কচুর শাক, শাপলার টক, গন্ধরাজ লেবু এবং দুটি কাঁচা লঙ্কা দিয়ে দেবীর ভোগ সাজানো হয়।

দশমীর পরেও শেষ হয় না পুজো, ঘটে কালী আরাধনা

রায়বাড়ির দুর্গাপুজোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব দশমীর পর। সাধারণত দশমীর পুজো শেষে দেবী বিসর্জনের প্রস্তুতি শুরু হলেও এখানে মায়ের ঘট সঙ্গে সঙ্গে বিসর্জন করা হয় না। প্রথমে বেদি থেকে নারায়ণ শিলা সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর দেবীকে নিবেদন করা হয় আমিষ ভোগ, যার মধ্যে রয়েছে জোড়া ইলিশ। তারপর নিয়ম মেনে দেবীর ঘটে কালীপুজো সম্পন্ন করা হয়। কালীপুজোর পরেই হয় ঘট বিসর্জন।

এই বিরল প্রথাকে ঘিরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যেমন গভীর আবেগ রয়েছে, তেমনই পুজোর দিনগুলিতে বহু দর্শনার্থী ভিড় করেন এই ঐতিহ্য প্রত্যক্ষ করতে। ঢাকের বাদ্যি, চণ্ডীপাঠ, প্রদীপের আলো এবং পুজোর নানা আচার মিলিয়ে রায়বাড়ি হয়ে ওঠে ভক্তি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য মিলনক্ষেত্র।

পরিবারের প্রধান সদস্য পার্থ প্রতীম রায় জানান, পূর্বপুরুষদের শুরু করা এই পুজো মাঝের কয়েক বছর নানা কারণে ব্যাহত হলেও তাঁর ছেলের উদ্যোগে ফের তা চালু করা সম্ভব হয়েছে। পরিবারের বিশ্বাস, দেবীর আশীর্বাদেই আগামী দিনেও আরও নিষ্ঠা ও আড়ম্বরের সঙ্গে এই পুজো চালিয়ে যেতে পারবেন তাঁরা।

ঐতিহ্যই তাঁদের পরিচয়, বিশ্বাসই তাঁদের শক্তি

সময়ের পরিবর্তন, দেশভাগের স্মৃতি এবং পারিবারিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে কৃষ্ণনগরের বেজিখালির রায়বাড়ির দুর্গাপুজো আজও বহন করে চলেছে অতীতের উত্তরাধিকার। নীলবর্ণা ভদ্রকালী রূপের আরাধনা, নারায়ণ শিলার পুজো এবং দশমীর পর ঘটে কালীপুজোর মতো ব্যতিক্রমী রীতিই এই পুজোকে দিয়েছে বিশেষ মর্যাদা।

রায় পরিবারের কাছে এই পুজো নিছক ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং পূর্বপুরুষদের স্মৃতি, পারিবারিক ঐক্য, গভীর বিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার এক নিরন্তর অঙ্গীকার। তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বয়ে চলা সেই ঐতিহ্য আজও প্রমাণ করে—সময়ের স্রোত বদলালেও নিষ্ঠা ও বিশ্বাসের বন্ধন সহজে মুছে যায় না।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*