রোজদিন ডেস্ক :
সাহিত্য জগতে ইন্দ্রপতন। চলে গেলেন চৌরঙ্গী, জন অরণ্য সহ একাধিক কালজয়ী গ্রন্থের রচয়িতা মণিশঙ্কর মুখার্জি, যিনি শঙ্কর নামেই আমজনতার মনের মণিকোঠায় স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। শুধু সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতই না, তাঁর প্রয়াণে সর্বত্র গভীর শোকের ছায়া নামে। বয়েস হয়েছিল ৯২। ব্যক্তি জীবনে ও বহু দুঃখ, কষ্টের সম্মুখীন হয়েও মনের জোর হারাননি। তাঁর অনাবিল হাসি মুখ, সুব্যবহার, অপুর্ব লেখনিতে মুগ্ধ হননি, এমন মানুষ বিরল।। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠককুল তাঁর লেখনিতে বুঁদ হয়ে থেকেছেন।
তাঁর লেখা নিয়ে একাধিক জনপ্রিয় ছবি হয়েছে। সত্যজিৎ রায় তাঁর লেখা নিয়ে একাধিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। রবীন্দ্র পুরস্কার, একাডেমি পুরস্কার সহ বহু সম্মানীয় পুরস্কার পেয়েছেন। নিরহঙ্কার, সদালাপী, সদাহাস্যময় এই লেখকের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ রাজ্য।
বয়েসের কারণে বেশ কিছুদিন তিনি অসুস্থ ছিলেন, ভর্তি ছিলেন হাসপাতালে।। সূত্রের খবর, মস্তিষ্কে টিউমারের জন্য কষ্টও পাচ্ছিলেন। চিকিৎসাও চলছিল, আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠছিলেন, কিন্তু শেষ রক্ষা হোল না, আজ দুপুরে তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন।
তাঁর অক্লান্ত লেখনিতে সমাজের বিভিন্ন অংশের ছবি প্রাণ পেয়েছে। চৌরঙ্গী উপন্যাসে তাঁর সৃষ্ট “স্যাটাদা” চরিত্র এখনও আমজনতার মনে অম্লান, ততোধিক উজ্জ্বল এই লেখার চলচ্চিত্রায়নে স্যাটাদার চরিত্রে মহানায়ক উত্তম কুমারের অনবদ্য অভিনয়।
নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ছবি ও তাঁর নানা লেখায় উঠে এসেছে। বছর দশেক আগে তাঁর আত্মজীবনী মূলক লেখা “একা একা একাশি” পাঠক মহলে তুমুল সাড়া জাগায়। কিভাবে সাধারণ এক পরিবারের সন্তান লেখার জগতে অসাধারণ হয়ে উঠলেন, তা এক বিস্ময়।
১৯৩০, সালের ৭ ডিসেম্বর পূর্ব বাংলার যশোরের বনগ্রামে তাঁর জন্ম। কিশোর বয়েসে দেশ ভাগের যন্ত্রণা সহ্য করে এপারে এসেছিলেন তাঁরা। স্বাধীন দেশে স্কুলে ভর্তি হয়ে বহুদিন “বাঙাল” বলে কটাক্ষ শুনতে হোত। তাই নিয়ে কিশোর মনে ক্ষোভ জমলেও কখনো তার বহিঃপ্রকাশ হয়নি। স্বভাব শান্ত, মধুর স্বভাবের মানুষটি নিজেও সবাইকে আপন করে নিতে পারতেন, ক্রমে অন্যদেরও আপনজন হয়ে উঠেছিলেন।অগণিত পাঠকের সঙ্গে মনোজগতের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তাঁর কত অজানারে, চৌরঙ্গী, সম্রাট ও সুন্দরী, জন অরণ্য, সীমাবদ্ধ ইত্যাদি লেখা পড়ে নিজেদের সঙ্গে মিল পেয়েছেন কত অজস্র মানুষ।
ওপার বাংলা থেকে ছিন্নমূল হয়ে এপারে আসা, প্রথমে উত্তর ২৪ পরগণা, পরে গঙ্গার ওপারে হাওড়ায় পরিবারের সঙ্গে চলে আসা, সেখানেই পড়াশোনা, সাহিত্য সাধনার শুরুও। মাত্র ১৭ বছর বয়েসে পিতৃহারা, তখন থেকেই কঠিন জীবন সংগ্রাম ও শুরু তাঁর। মা অভয়ারানীর সংগ্রামের সাথী হয়ে ওঠেন কিশোর শঙ্কর। জীবিকার জন্য কত রকমের কাজই করেছেন, বাস্তবকে খুব কাছে থেকে দেখেছেন, মনের অন্দরে একের পর এক অভিজ্ঞতা থেকে সৃষ্টি করেছেন অসামান্য সব উপন্যাস যার উপাদান তিনি সংগ্রহ করেছেন নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে, কলমে ফুটিয়ে তুলেছেন একের পর এক কালজয়ী চরিত্র, যারা ঘরের, কাছের চিরচেনা বলেই পাঠকের মনে হয়।
পুত্রের অকাল মৃত্যুর আঘাত তাঁকে বিধ্বস্ত করেছিল, তবু হার মানেননি, থামেনি কলম ও। এমনই ছিলেন তিনি, নীলকন্ঠর মত সব সহ্য করেছেন।
কলকাতা উচ্চ আদালতে শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েলের কাছে কাজ করতে এসে তাঁর জীবনের অভিমুখই বদলে যায়। তাঁর প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা বিভিন্ন লেখায় মিলেছে।
এমন একজন বিরল প্রতিভার লেখকের প্রয়াণে আমজনতা তাঁদের প্রিয়জনকে হারালেন বলে মনে করছেন।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা শঙ্করের প্রয়াণে গভীর শোক ব্যক্ত করেন।
তিনি চলে গেছেন, তবু তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর অনন্য সাহিত্য সম্ভারের মধ্যে, প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ।

Be the first to comment