নিজস্ব সংবাদদাতা, চাকদহ:- দুর্গাপুজোর আনন্দ দেখতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ফিরল না বাড়ির মানুষটি। কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে সপ্তমীর সন্ধ্যায় পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে নদিয়ার চাকদহের নতুনপাড়ার বাসিন্দা আরতি সরকার বিশ্বাসের (৪৫)। চোখের সামনে স্ত্রীকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান স্বামী রাম সরকার। স্ত্রীকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও শেষরক্ষা করতে না পারার আক্ষেপ তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
সেদিন মণ্ডপে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলেন রাম ও আরতি। সঙ্গে ছিলেন তাঁদের এক আত্মীয় এবং শালির মেয়েও। রামের বর্ণনা অনুযায়ী, মণ্ডপে তখন উপচে পড়া ভিড়। আচমকাই বাঁশি বাজিয়ে দর্শনার্থীদের বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আর তাতেই শুরু হয় হুড়োহুড়ি। একসঙ্গে বহু মানুষ বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলে ভিড়ের চাপে মাটিতে পড়ে যান আরতি। পরে ভিড়ের নীচে চাপা পড়ে যান তিনি।

স্ত্রীর সেই মর্মান্তিক পরিণতির কথা বলতে গিয়ে বারবার ভেঙে পড়ছেন রাম। তাঁর কথায়, আরতি শারীরিকভাবে খুব একটা শক্তপোক্ত ছিলেন না। ভিড়ের চাপে পড়ে যাওয়ার পর আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি তিনি। অসহায় স্বামীর আক্ষেপ, “আমি ওকে বাঁচাতে পারলাম না।” হুড়োহুড়ির মধ্যে তাঁদের সঙ্গে থাকা শালির মেয়েও পড়ে গিয়েছিল। কোনওক্রমে তাকে উদ্ধার করতে পারলেও স্ত্রীকে আর বাঁচাতে পারেননি রাম। সেই যন্ত্রণা এখন প্রতিনিয়ত তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগানের এই দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। উৎসবের আনন্দের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই বিপর্যয়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে মৃতদের পরিবারে। আরতির মৃত্যুর খবর পৌঁছনোর পর থেকে শোকে ভেঙে পড়েছেন তাঁর পরিজনেরা।
এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মৃতদের পরিবারপিছু দু’লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কী কারণে এই বিপর্যয় ঘটল এবং এর পিছনে কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ঠাকুর দেখতে গিয়ে প্রাণ হারালেন চাকদহের আরতি। আর তাঁর স্বামী রাম সরকারের কাছে পুজোর সেই সন্ধ্যা হয়ে রইল এক দুঃস্বপ্ন। প্রিয় মানুষটিকে হারানোর শোকের পাশাপাশি স্ত্রীকে শেষ মুহূর্তে বাঁচাতে না পারার আক্ষেপই এখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা।

Be the first to comment