রমিত সরকার, নদীয়া:
শরতের সোনালি রোদে যখন চারদিকে উৎসবের আবহ, আকাশে-বাতাসে পুজোর গন্ধ, তখন দেবী দুর্গাকে মণ্ডপে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতিও যেন এক মহাযজ্ঞ। আর সেই যজ্ঞের সাক্ষী থাকল শান্তিপুর রেলস্টেশন। ট্রেনের কামরায় চেপে এবার কলকাতার উদ্দেশে পাড়ি দিলেন স্বয়ং দেবী উমা! তবে এই সফর নিছক কোনও পৌরাণিক কাহিনি নয়, বরং এর নেপথ্যে রয়েছে বাংলার মৃৎশিল্পীদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং এক অভিনব পরিবহণ ব্যবস্থা।

শান্তিপুর স্টেশনে ট্রেন এসে দাঁড়াতেই একটি কামরা যেন মুহূর্তে পরিণত হল প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার সাজঘরে। বৈষ্ণবনগরের মাটির গন্ধ মেখে, শিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি দুর্গাপ্রতিমা এবার রওনা দিল কলকাতার বরানগর ও যাদবপুরের উদ্দেশে। দীর্ঘ পরিশ্রমে গড়ে তোলা দেবীকে সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়াই এখন শিল্পীদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে এবারের যাত্রায় রয়েছে এক অভিনব বিষয়, যা শুনলে অনেকেই অবাক হবেন। সাধারণ যাত্রীরা যেমন নির্দিষ্ট ভাড়া দিয়ে টিকিট কেটে ট্রেনে ওঠেন, তেমনই দেবী দুর্গার প্রতিমা পরিবহণের ক্ষেত্রেও নেওয়া হয়েছে রেলের টিকিট। আর সেখানেই চমক! যাত্রী চারজন হলেও টিকিটের সংখ্যা ছয়। অর্থাৎ, প্রতিমাকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে রেলযাত্রার নিয়ম মেনেই করা হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।

রাতভর চলবে ট্রেনযাত্রা। গন্তব্যে পৌঁছনোর পর প্রতিমার গায়ে পড়বে শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জার ছোঁয়া। ভোরের আলো ফুটতেই নতুন মণ্ডপে নতুন রূপে দর্শন দেবেন দেবী দুর্গা। তারপর সেই প্রতিমাকে ঘিরেই শুরু হবে অগণিত মানুষের আবেগ, প্রার্থনা আর উৎসবের আনন্দ।
কিন্তু মণ্ডপের ঝলমলে আলো, চোখধাঁধানো সাজসজ্জা আর ঢাকের বাদ্যের আড়ালে থেকে যায় কিছু মানুষের নিরলস পরিশ্রমের গল্প। মৃৎশিল্পী থেকে শুরু করে প্রতিমা পরিবহণের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা—প্রত্যেকের ঘাম, সময় আর নিষ্ঠার মেলবন্ধনেই পূর্ণতা পায় দুর্গোৎসব।

দেবী দুর্গার এই ট্রেনযাত্রা তাই শুধুমাত্র একটি অভিনব ঘটনা নয়; এটি বাংলার শিল্প, সংস্কৃতি এবং পরিশ্রমী মানুষের জীবনের এক অনন্য ছবি। দেবীকে ঘিরে আমাদের যে আবেগ, তার পিছনে রয়েছে এমনই অসংখ্য নেপথ্য নায়কের গল্প। আর তাঁদের হাত ধরেই প্রতি বছর বাংলার ঘরে ঘরে, মণ্ডপে মণ্ডপে ফিরে আসেন উমা।
দুর্গাপুজো শুধু উৎসব নয়, এই উৎসবের প্রতিটি ধাপে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন, শ্রম আর ভালোবাসা।

Be the first to comment