নিজস্ব প্রতিনিধি, ধুবুলিয়া:
ধুবুলিয়ার তাতলা গ্রামের সরু গলি পেরিয়ে যে ছোট্ট কাঁচাবাড়িটি দেখা যায়, সেখানে বেড়ে উঠেছে অঙ্কিতা হালদার—নদীয়ার এক অদম্য মেয়ের গল্প, যে ফুটবলের স্বপ্ন আঁকড়ে আজ বাংলার অনূর্ধ্ব-১৭ দলে জায়গা করে নিয়েছে। বাড়ির অভাব-অনটন, বাবার অনুপস্থিতি, প্রতিদিনের সংগ্রাম—কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। বরং এসবই যেন তাকে আরও এগিয়ে যাওয়ার জেদ দিয়েছে।
অঙ্কিতার মা খ্যান্ত হালদার প্রতিদিন কাপড়ের বোঝা মাথায় নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ফেরি করেন। সংসারের চাপ তাঁর কাঁধে, তবুও মেয়ের খেলার সরঞ্জাম কিনে দিতে পিছপা হননি কখনও। মামা-মামির বাড়িতেই প্রায় দশ বছর বড় হওয়া অঙ্কিতা এখন নবম শ্রেণির ছাত্রী। চতুর্থ শ্রেণি থেকেই ফুটবলের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব। স্থানীয় মাঠে ছেলেদের সঙ্গে সমান তালে ফুটবল নিয়ে দাপিয়ে বেড়ায় সে। কে কী বলল, কে সন্দেহ করল—এসব তার জীবনে কখনও বাধা হয়নি।
এবার সেই লড়াইয়েরই বাস্তব ফল পেল অঙ্কিতা। জাতীয় স্তরে প্রথমবার নিজের পায়ের ছাপ রেখে বাংলার হয়ে অনূর্ধ্ব-১৭ ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে সোমবার অন্ধ্রপ্রদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে সে। সঙ্গে রয়েছে নদীয়ার আরও চার ফুটবলার—ধুবুলিয়ার বিদিশা বৈরাগ্য, জালালখালির শ্রেয়া বালা, কল্যাণীর অঙ্কিতা দাস এবং করিমপুরের পিউ রায়। একসঙ্গে পাঁচজন নদীয়ার ফুটবলার বাংলার দলে সুযোগ পাওয়ায় জেলার ক্রীড়া মহলে স্বভাবতই উচ্ছ্বাস।
তবে অঙ্কিতার গল্প আলাদা, আরও বেশি অনুপ্রেরণাদায়ক। সল্টলেক স্টেডিয়াম থেকে রওনা হওয়ার আগে ফোনে সে জানায়,
“বাংলার দলে জায়গা পেয়ে ভীষণ ভালো লাগছে। এটা শুধু শুরু। আমার বড় স্বপ্ন দেশের জার্সি গায়ে মাঠে নামা। বাড়িতে আর্থিক সমস্যা আছে, তাই মাঝেমধ্যে লড়াই আরও কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু মা প্রতিদিনই কাপড় বিক্রি করে আমাকে জুতো, জার্সি কিনে দেয়। ভবিষ্যতে কোনও বড় ক্লাবে খেলতে চাই।”
অঙ্কিতার প্রশিক্ষক দেবকুমার মজুমদার তাঁর সম্পর্কে বলেন,
“ওর মধ্যে দারুণ প্রতিভা আছে। পরিশ্রম করতে জানে, স্বপ্নের জন্য লড়াই করতে জানে। আমরা সবাই ওর পাশে আছি।”
মামি মিরা গুহ মনে করেন, করোনার দীর্ঘ ছুটিই অঙ্কিতাকে ফুটবলের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করেছে।
“ও তখন সারাদিন ফুটবল খেলত—মাঠে ছেলেদের সঙ্গেও। আমরা কখনও ওকে থামাইনি। পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে বলেছি শুধু। আজ বাংলার দলে ওর নাম—আমাদের জন্য এটা গর্বের।”
তাতলার সেই ছোট্ট বাড়ির ভেতর থেকে জন্ম নিয়েছে এক বড় স্বপ্ন। এখন অঙ্কিতার লক্ষ্য আরও উঁচু—ভারতের হয়ে মাঠে নামা। পথ দীর্ঘ, চ্যালেঞ্জ অনেক, তবু তার চোখে এক অদম্য আলো। ধুবুলিয়া অপেক্ষা করছে—একদিন হয়তো সেই আলো দেশের জার্সিতে জ্বলজ্বল করবে।

Be the first to comment