এভাবেও ফিরে আসা যায়

Spread the love

পিয়ালী: কলকাতা এত বছর আমি তোমাকে প্রশ্ন করেছি আমি তোমার কি ক্ষতি করেছিলাম ? কেন আমাকে চলে যেতে হয়েছিল? আজ তোমার কাছে উত্তর চাইতে আসিনি শুধু বলতে এসেছি আমি ফিরে এসেছি।

তসলিমা তার বক্তব্যে বলেন এই অগাস্ট মাস তার জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই মাসে তার জন্ম, কান্না চেপে একথাও বলেন আজ থেকে বত্রিশ বছর আগে তার দেশ বাংলাদেশ থেকে নির্বাচিত হয়ে হতে হয় তাকে এই অগাস্ট মাসে।

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে এ বলেন, আগস্ট মাসের প্রথম দিনে আবার তিনি বাংলায় ফিরে এলেন। তসলিমা বলেন আজ আমি কলকাতায় ফিরে এসেছি এই একটি বাক্য উচ্চারণ করতে আমার উনিশ বছর লেগেছে। প্রতিটি দিন নিজের ঠিকানা হারানোর গল্প। তাসলিমার বাংলায় ফেরা এবং এই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা ওসমান গনি মল্লিক বাংলায় আসার বন্ধ দরজায় বারবার কড়া নেড়েছেন, এ কথা বলে বারবার তসলিমা তাকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।

২২ শে নভেম্বর ২০০৭ কলকাতা থেকে বিতাড়িত হন তসলিমা নাসরিন। ইসলামী মৌলবাদীরা মেদিনীপুর শহরে তাকে কবিতা পড়তে দেয়নি শিলিগুড়ির বইমেলায় যেতে দেয়নি। এদের সমর্থন করে বামপন্থী সরকার তাসলিমার বই নিষিদ্ধ করে নিষিদ্ধ হয়ে যায় নববর্ষের একটি বামপন্থী শারদীয় পত্রিকা। কলকাতা শহরের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে টিপু সুলতান মসজিদের ইমাম তসলিমার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন তার বিতরণের দাবিতে ইদ্রিস আলী সিদ্দিকুল্লারা শহরের জমায়েত করে হুমকি দেন এবং তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিরা একে নীরব সমর্থন যুগিয়ে যান।

একুশ নভেম্বর তসলিমা কে কেন্দ্র করে কলকাতার বুকে দাঙ্গা হয়। তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিজীবীদের একাংশের ভূমিকা এবং পার্কসার্কাসের দাঙ্গা তসলিমাকে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য করে। বাম সরকারের আমলেই তাকে কলকাতা ছেড়ে চলে যেতে হয় পরবর্তীতে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে তিনি এখানে ফিরে আসতে পারেননি।

 

এসব ঘটনা এখন ইতিহাস। তসলিমা নিজের ভাষাতেই বলি, বন্ধ দরজা খোলার দিন যেমন ইতিহাস মনে রাখে কারা দরজা খোলা রাখল তাদের কথাও ইতিহাস মনে রাখবে। তাঁর জোরালো বক্তব্য অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে চিরস্থায়ী নয়। তাইতো জুলাই মাসে শেষ দিন প্রায় কুড়ি বছর পর কলকাতায় ফেরা তাঁর। তসলিমা বলেন ,ধন্যবাদ কলকাতা, ধন্যবাদ পশ্চিমবঙ্গ।

শনিবার ১ আগস্ট রবীন্দ্র সদন থেকে বারবার ধ্বনি উঠছিল তসলিমা মানে একটি দেশ। আর তার বক্তব্য পেশের সময় তসলিমা বললেন শেষপর্যন্ত কোন মানচিত্র নয়। মানুষের ভালোবাসাই আমার দেশ, ভিড়ে ঠাসা রবীন্দ্রসদন বারবার বলছিলো, তসলিমা যেন বাংলায় বারবার আসেন, তিনি যেন পাকাপাকিভাবে বাংলায় বসবাস করেন । তার ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছিলেন সমবেত দর্শক শ্রোতা মন্ডলী।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, শৃঙ্খলা মুক্ত ,বাঁধন মুক্ত পশ্চিমবঙ্গ এখন।কথা বলার সুযোগ রয়েছে। তসলিমা নাসরিন বঙ্গভূমিতে প্রবেশ করেছেন। বাংলায় সংবিধান বাক স্বাধীনতা সুরক্ষিত এখানে কোন ভাবে ধমক চমক দেখিয়ে লাভ নেই দেখে নেব আটকে দেব চলবে না। মুখ্যমন্ত্রী ও তথ্যসংস্কৃতি দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবে তসলিমা কে স্বাগত জানান শুভেন্দু অধিকারী। বলেন , ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। একবার নয় ,বারবার আসবেন আপনি। সুরক্ষিত পশ্চিমবঙ্গে আপনার কোন অসুবিধা হবে না। শুধু মুখের পরিবর্তন নয়। ব্যবস্থার ও পরিবর্তন হয়েছে।

সাহিত্যিক সমাজকর্মী মোহিত রায় বলেন, পশ্চিমবঙ্গে নতুন প্রভাতের সূচনা হয়েছে । তিনি মুখ্যমন্ত্রী কে ধন্যবাদ জানান। মোহিত বাবু বলেন আমরা পশ্চিমবঙ্গে সাংস্কৃতিক মিছিল করতে চাই যার সামনে থাকবেন তসলিমা। তবে কলকাতায় ফেরার পাশাপাশি তসলিমা নিজের কবিতা দিয়েই তার বাংলাদেশ ফেরার আকাঙ্ক্ষার কথাও বললেন মোহিত বাবু।

এদিন তসলিমার ফেরা কে কেন্দ্র করে রবীন্দ্র সদনের মঞ্চ ও দর্শক আসনে যেন চাঁদের হাট বসেছিল।

উপস্থিত রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বলেন, অনেক বছর ধরে অপেক্ষা করে আছি তসলিমাকে দুটো কথা বলার জন্য। ওয়েলকাম ব্যাক, তসলিমা ।আমরা ভাবতে পারি না ভারতবর্ষের মতো জায়গায় তসলিমার স্থান হতে পারে না। ঢাকা ও কোলকাতা, দুটোই তার কাছে নো এন্ট্রি বোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছিল ।যাক কলকাতারটা হঠলো। সমবেত দর্শক মন্ডলী তখন বলেন বাংলাদেশের বা ঢাকারটাও উঠে যাবে। স্বপনবাবু বলেন যে রকমের পরিস্থিতি ,পরিবেশের মধ্যে তসলিমা কে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই পরিস্থিতি যেন আর কোনদিন ফেরত না আসে। স্বপনবাবু আরো বলেন যে কোনভাবেই তসলিমার সব কথার সঙ্গে আমি একমাত্র কিন্তু উনি ওনার কথা বলতে পারবেন না এই অসভ্যতাটাকে দূর করা উচিত ।মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, আপনি যখন ইচ্ছা আসবেন। স্বপন বাবু বলেন উনি এখন দিল্লিতে আছেন, উনি তো এখানে আসবেনই উনি তো বাংলা ভাষায় লেখেন । তারপর স্বপনবাবু বলেন, তসলিমা ইউ আর ব্যাক ইন আওয়ার স্টেট, অ্যান্ড ইউ উইল স্টে ইন আওয়ার স্টেট

অনুষ্ঠানে উপস্থিত পুর ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল , তসলিমা কে নিয়ে লেখা তার স্বরচিত কবিতা পড়ে শোনান। প্রসঙ্গত গতকাল মাঝরাতে অগ্নিমিত্রা এই কবিতাটি লিখে সমাজ মাধ্যমে তসলিমা কে স্বাগত জানান।

মঞ্চে উপবিষ্ট বিশিষ্ট বিজেপি নেতা এবং ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায়, তসলিমা কে অসম সাহসিনী, ময়মনসিংহিনী ,নির্ভীক সত্যের পূজারী বলে উল্লেখ করেন। তথাগত বাবু বলেন আমার থেকে কুড়ি বছরের ছোট তসলিমা, তাঁকে কুর্নিশ জানিয়ে,আমার সম্মান বৃদ্ধি পেল।

কবি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় তার বক্তব্যে চমৎকারভাবে বললেন ,অন্ধকারের সীমা/ পেরোলেই তসলিমা।। তিনি আরো বলেন, জিতে গেছে কাগজ-কলম কালি/ হেরে গেছে ইদ্রিস আলী। তিনি তসলিমা কে আহবান জানিয়ে বলেন ,কলকাতায় থাকুন পশ্চিমবাংলায় থাকুন। আমরা ওপার বাংলা এপার বাংলা আলাদা কিছু বুঝিনা। আমরা বুঝি দুয়ে মিলে অপার বাংলা,তারই প্রতিনিধি তসলিমা ।

লেখিকা ও সমাজ কর্মী শাশ্বতী ঘোষ প্রশ্ন তোলেন বামপন্থীদেরও কি মুসলমান ভোটের কাছে হাত পা বাঁধা ছিল ? তসলিমাকে তাড়ানো প্রসঙ্গে তাঁর এই মন্তব্য।

কলকাতায় তিনি বারবার আসতে চান এই কথা বারে বারে বলেন তসলিমা। বলেন আমি বিশ্বের বহু বইমেলা দেখেছি কিন্তু কলকাতা বইমেলার মত এত সুন্দর বইমেলা আমি কোথাও দেখিনি। আমি কোন উৎসব পালন করি না ,আমার কাছে কলকাতা বইমেলাই হল বাৎসরিক উৎসব।

পয়লা আগস্ট রবীন্দ্রসদনের এই অনুষ্ঠান দেখতে আসেন অগণিত মানুষ বহু মানুষ টিকিট না পেয়ে নিরাশ হয়ে ফিরে যান। তসলিমা কে একটু ছোয়ার জন্য তার কবিতা শোনার জন্য হল ভর্তি মানুষের উন্মাদনা ছিল দেখার মতো। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল তসলিমার স্বরচিত কবিতা পাঠ, এবং বলিষ্ঠ ও সুন্দর কন্ঠের মৌসুমী হোসেনের অনবদ্য গান। সারা কলকাতা তথা বাংলার আজ নজর ছিল রবীন্দ্র সদনের দিকে। তসলিমা শুধু কুড়ি বছর বাদে ফিরলেনই না প্রমাণ করলেন এভাবেও ফিরে আসা যায়। তবে তসলিমা নাসরিনের পথচলা এখানেই শেষ নয়। তসলিমা কে ফিরতে হবে বুড়িগঙ্গা ,ব্রহ্মপুত্রের পারে এই আশা রইল।।

স্থান: রবীন্দ্রসদন, অনুষ্ঠানের নাম ফেরা, বক্তা তসলিমা নাসরিন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*