রমিত সরকার, নদীয়া :
উৎসবপ্রেমী কৃষ্ণনগরে ক্রমেই বাড়ছে গণেশপুজোর উন্মাদনা, পাড়ার মোড়ে মোড়ে বাপ্পার নিত্যনতুন রূপ
উৎসবের শহর কৃষ্ণনগর। নদীয়া জেলার এই শহরের মানুষের উৎসবপ্রেম যেন একটু অন্যরকম। ধর্মীয় উৎসব হোক কিংবা লোকাচার—যে কোনও উৎসবকেই আপন করে নেওয়ার এক সহজাত প্রবণতা রয়েছে কৃষ্ণনগরবাসীর মধ্যে। আর সেই উৎসবের তালিকায় গত কয়েক বছরে বেশ জোরালোভাবেই জায়গা করে নিয়েছে গণেশ চতুর্থী।
একসময় যে উৎসবের সঙ্গে মূলত মহারাষ্ট্রের নামই জড়িয়ে ছিল, সেই গণেশপুজোই এখন কৃষ্ণনগরের অলিগলি, পাড়ার মোড় এবং ক্লাব চত্বরে ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে। প্রতি বছরই বাড়ছে গণেশভক্তের সংখ্যা, বাড়ছে পুজো কমিটির সংখ্যা, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মণ্ডপ ও প্রতিমার অভিনবত্ব।
কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য বহু পুরনো। সেই মৃৎশিল্পের শহরেই গণপতি যেন ধরা দিচ্ছেন একেবারে অন্য রূপে। কোথাও পাহাড়ের উপরে আসন গ্রহণ করেছেন গণেশ, কোথাও আবার নিজের বাহন ইঁদুরকে জড়িয়ে ধরে রয়েছেন বাপ্পা। কোথাও প্রতিমার অলংকরণে নতুন ভাবনা, কোথাও মণ্ডপসজ্জায় উঠে আসছে ভিন্ন কোনও কল্পনা। সব মিলিয়ে কৃষ্ণনগরের গণেশপুজো এখন শুধু ধর্মীয় আচার নয়, হয়ে উঠছে শিল্প ও সৃজনশীলতারও এক নতুন মঞ্চ।
এই নবউন্মাদনার শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় কয়েক বছর আগে। কৃষ্ণনগর শহরে গণেশপুজোর সূচনালগ্নের অন্যতম নাম নবজাগরণ ক্লাব। তাদের ‘লাল গণেশ’কে ঘিরে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেই পথই যেন আরও প্রশস্ত হয়েছে। আজ শহরজুড়ে পঞ্চাশটিরও বেশি গণেশপুজো কমিটির দেখা মিলছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
নবজাগরণ ক্লাবের এক পুজো কর্মকর্তা বলেন, তাঁরাই প্রথম দিকে ভাবনাচিন্তা করেছিলেন কৃষ্ণনগরে গণেশপুজো করা যায়। তখন হয়তো ভাবা যায়নি যে একদিন এই উৎসব এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। এখন শহরের বিভিন্ন প্রান্তে গণেশপুজো হতে দেখে তাঁরা আনন্দিত। তাঁর কথায়, কৃষ্ণনগরবাসী আজ অন্য দেবদেবীর মতোই গণেশকেও আপন করে নিয়েছেন। কয়েক দিন ধরে চলে তাঁদের পুজোর আয়োজন এবং শেষ পর্যন্ত নিয়ম মেনে সম্পন্ন হয় গণেশবিগ্রহের নিরঞ্জন।
তবে শুধু পুরনো পুজোগুলিই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু নতুন গণেশপুজোও কৃষ্ণনগরের উৎসবের মানচিত্রে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম শক্তিনগর মাঠ যুবকবৃন্দের ‘মহা গণপতি’। অল্প সময়ের মধ্যেই এই পুজো ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশেষ আগ্রহ। প্রতিমা, মণ্ডপ এবং আয়োজনের অভিনবত্ব দর্শনার্থীদের টানছে।
সরকারি কলেজের কাছাকাছি নবোদয় ক্লাবেও দেখা মিলেছে ভিন্ন ভাবনার গণেশ প্রতিমার। শহরের অন্যান্য প্রান্তের বিভিন্ন পুজোমণ্ডপেও প্রতিমা নির্মাণ ও মণ্ডপসজ্জায় রয়েছে নিজস্ব পরিকল্পনার ছাপ। ফলে একই দেবতার পুজো হলেও প্রতিটি মণ্ডপে গণেশ যেন আলাদা আলাদা গল্প বলছেন।
কৃষ্ণনগরের গণেশপুজোর এই বিস্তারকে শুধু কোনও একটি ধর্মীয় উৎসবের প্রসার হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো ছবিটা ধরা পড়বে না। এর মধ্যে রয়েছে শহরের মানুষের উৎসবকে গ্রহণ করে নেওয়ার মানসিকতা, শিল্পের প্রতি টান এবং নতুন কিছু করার আগ্রহ। মহারাষ্ট্রের গণেশোৎসবের যে আবহ বহু দূর থেকে মানুষকে টানে, তারই এক ছোট্ট সংস্করণ যেন তৈরি হয়েছে কৃষ্ণনগরের বুকে।
প্রতিমার গড়ন থেকে মণ্ডপের ভাবনা—সবেতেই যেন চলছে এক নীরব প্রতিযোগিতা। কে কতটা নতুনভাবে গণেশকে উপস্থাপন করতে পারে, সেই ভাবনাই এখন পুজো কমিটিগুলির অন্যতম আকর্ষণ। আর দর্শনার্থীরাও পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে দেখছেন সেই নতুন নতুন ভাবনার প্রতিফলন।
একদিকে কৃষ্ণনগরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের সৃজনশীলতা—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে গণেশপুজো শহরে তৈরি করছে এক নতুন উৎসব-সংস্কৃতি। ফলে প্রশ্নটা এখন আর শুধু ‘কৃষ্ণনগরে গণেশপুজো হয় কি না’—বরং প্রশ্ন হচ্ছে, আগামী দিনে এই সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
মহারাষ্ট্রের গণেশোৎসবের সঙ্গে তুলনা হয়তো এখনও বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। কিন্তু কৃষ্ণনগরের উৎসবপ্রেমী মানুষ যে বাপ্পাকে আপন করে নিয়েছেন, তা এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই।
মহারাষ্ট্রে গণেশের যে আবেগ, কৃষ্ণনগরের মাটিতেও আজ তারই প্রতিধ্বনি—পাড়ার মোড়ে, গলির শেষে, মণ্ডপের আলোয়।
এক কথায় বলা যায়, মহারাষ্ট্রের পরেই যেন তৈরি হয়েছে এক ছোট্ট ‘মহারাষ্ট্র’—আর তার নাম কৃষ্ণনগর।

Be the first to comment