নিজস্ব সংবাদদাতা, নদীয়া : মহতপুর থেকে বুধবার চাপড়া ব্লক অফিসে হাজির হয়েছিলেন আলাই শেখ। সঙ্গে তাঁর ৯০ শতাংশ বিশেষভাবে সক্ষম ছেলে সরিফুল শেখ। যাঁদের আদৌ শুনানিতে আসার কথা ছিল না, তাঁদেরই হাতে পৌঁছেছে শুনানির নোটিশ। আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা নিয়েই ছেলেকে সঙ্গে করে লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হন আলাই শেখ।
আলাই শেখের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় রয়েছে। শুধু তাই নয়, বৈধ পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে তাঁর পাসপোর্টও আছে। তবুও তাঁর এবং বিশেষভাবে সক্ষম ছেলের নামেই শুনানির নোটিশ ইস্যু হওয়ায় হতবাক পরিবারটি। আবেগপ্রবণ কণ্ঠে আলাই শেখ বলেন, “আমাদের সব কাগজ ঠিক আছে। ২০০২ সাল থেকেই ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে। তবুও আমাকে আর আমার ছেলেকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। আমার ছেলে ৯০ শতাংশ বিশেষভাবে সক্ষম। ওকে নিয়ে এখানে আসা কতটা কষ্টের, সেটা কেউ বুঝল না।”
এই ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নদীয়া জেলাজুড়েই একই ছবি। নির্বাচন কমিশনের তথাকথিত ‘নো ম্যাপিং’ ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার বৈধ ভোটারের নামে ভুলবশত শুনানির নোটিশ ইস্যু হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে আসা সাধারণ মানুষকে অকারণে ব্লক অফিসে শুনানির লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, শুধুমাত্র সিস্টেমগত ত্রুটির কারণেই নদীয়া জেলায় প্রায় ৯ হাজার ভোটারের নাম ‘নো ম্যাপিং’ তালিকায় উঠে আসে। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক এমন ভোটার রয়েছেন চাকদহ, রানাঘাট উত্তর-পূর্ব এবং কল্যাণী বিধানসভা এলাকায়। নোটিশ হাতে পেয়ে শুনানির প্রথম দিন থেকেই জেলার বিভিন্ন ব্লক অফিসে ভিড় জমাতে শুরু করেন ভোটাররা—এমনটাই প্রশাসনের দাবি।
এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে নির্বাচন কমিশন ২৭ ডিসেম্বর একটি লিখিত নির্দেশ জারি করে। সেখানে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, যেসব ভোটার শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত বা সিস্টেমগত ত্রুটির কারণে ‘আনম্যাপড’ হয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও শুনানির প্রয়োজন নেই। নির্দেশিকায় আরও বলা হয়, অনলাইন ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হওয়া শুনানির নোটিশ ভোটারদের কাছে পাঠানো হবে না। সেগুলি সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আধিকারিকদের কাছেই সংরক্ষিত থাকবে। পরবর্তী সময়ে জেলা নির্বাচন আধিকারিকরা ইআরও বা এএইআরও-র মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
এই নির্দেশের পর বুথ লেভেল অফিসাররা বুথ ভিত্তিক যাচাই শুরু করেন। তাতেই সামনে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য— নদীয়া জেলায় প্রায় ৮ হাজার ৯০০ জন ভোটারের ম্যাপিং আগে থেকেই সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের নামে নোটিশ ইস্যু হয়েছে। সেই তালিকা ইতিমধ্যেই প্রশাসনের তরফ থেকে কমিশনের কাছে পাঠানো হচ্ছে।
তবে কমিশনের এই অপরিকল্পিত ও ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থায় ক্ষুব্ধ ভোটারদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে ভোটার হওয়া সত্ত্বেও হঠাৎ করে শুনানির নোটিশ পাওয়া মানসিক চাপ ও ভয় তৈরি করেছে। অনেকের মধ্যেই নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার নিয়ে অযথা আশঙ্কা জন্মেছে।
প্রশাসনের একাংশের ধারণা, এই সংখ্যাটা আরও কিছুটা বাড়তে পারে। সেই কারণেই প্রযুক্তিগত ত্রুটিতে বাদ পড়া ভোটারদের খোঁজার দায়িত্ব এবার জেলা শাসকদের হাতেও তুলে দেওয়া হয়েছে। এসআইআর প্রথম পর্বের কাজ শেষে জানা গিয়েছে, নদীয়া জেলায় মোট ২ লক্ষ ৮১ হাজার ভোটারকে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় পাওয়া যায়নি। পরবর্তী যাচাইয়ে সেই সংখ্যা কিছুটা কমে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ২ লক্ষ ৭২ হাজারে।
প্রযুক্তিগত ভুলের খেসারত যে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হচ্ছে—নদীয়ার ব্লক অফিসগুলির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা উদ্বিগ্ন মুখগুলোই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

Be the first to comment