রমিত সরকার, নদিয়া:
প্রতিদিনের জীবন অনেকটা লোকাল ট্রেনের মতোই—নির্দিষ্ট সময়ে ছুটে চলা, নির্দিষ্ট গন্তব্য, পরিচিত মুখ, চেনা শব্দ, একই ব্যস্ততা, একই ক্লান্তি। সকাল থেকে সন্ধ্যা—হাজার হাজার মানুষের জীবনের গল্প বয়ে নিয়ে চলে এই লোকাল ট্রেন। কেউ অফিসে যান, কেউ ব্যবসার কাজে, কেউ পড়াশোনার তাগিদে, কেউ আবার জীবিকার সন্ধানে। প্রত্যেকেরই আলাদা গল্প, আলাদা সংগ্রাম, আলাদা গন্তব্য—তবু ট্রেনের কামরার ভেতরে তারা যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা।
সেদিনও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
নদিয়ার কৃষ্ণনগর স্টেশন থেকে বিকেলের দিকে শিয়ালদহগামী এক লোকাল ট্রেন ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে। প্ল্যাটফর্মে তখনও শেষ মুহূর্তের দৌড়ঝাঁপ—কেউ ছুটে এসে দরজার হাতল ধরে উঠছেন, কেউ জানলা দিয়ে বিদায় জানাচ্ছেন প্রিয়জনকে, কেউ আবার সিট বাঁচিয়ে রাখার ব্যস্ততায় চিৎকার করে ডাকছেন পরিচিত কাউকে। ট্রেন ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধাতব চাকার ছন্দ, হকারের ডাক, মোবাইল ফোনের রিংটোন, যাত্রীদের কথাবার্তা আর ক্লান্ত নিঃশ্বাসে ভরে উঠেছিল পুরো কামরা।
যেমনটা প্রতিদিন হয়, সেদিনও কামরার প্রতিটি সিট প্রায় পূর্ণ। দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের ভিড়ও ছিল চোখে পড়ার মতো। কারও কাঁধে অফিস ব্যাগ, কারও হাতে বাজারের থলে, কারও চোখে সারাদিনের ক্লান্তির ছাপ। কেউ সংবাদপত্রে মুখ গুঁজে আছেন, কেউ মোবাইলের পর্দায় ব্যস্ত, কেউ আবার জানলার বাইরে দ্রুত পাল্টে যেতে থাকা দৃশ্যের দিকে অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে।

সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। চেনা। বহুদিনের অভ্যস্ত।
ঠিক সেই চেনা দৃশ্যের মধ্যেই হঠাৎ জন্ম নেয় এক অচেনা মুহূর্ত।
ট্রেন কৃষ্ণনগর ছেড়ে কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর এক মধ্যবয়সি ব্যক্তি এসে বসেন বিপরীত দিকের একটি সিটে। প্রথম দেখায় তাঁকে আলাদা করে চেনার কোনো উপায় ছিল না। খুবই সাধারণ পোশাক, মুখে শান্ত অভিব্যক্তি, হাতে একটি পুরনো, ব্যবহার-ক্লান্ত ব্যাগ। ভিড়ের মধ্যে তিনি ছিলেন আর পাঁচজন সাধারণ যাত্রীর মতোই।
কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বোঝা গেল, তিনি শুধু একজন যাত্রী নন—তিনি নিজের ভেতরে বয়ে নিয়ে চলেছেন এক আলাদা জগৎ।

নিঃশব্দে ব্যাগ খুলে তিনি বের করলেন একটি কিছুটা ভাঁজ পড়া কাগজ এবং কালো কালি ভরা একটি পেন। তারপর ধীরে ধীরে নিজেকে যেন চারপাশের সমস্ত শব্দ, কোলাহল, ভিড় আর ব্যস্ততা থেকে সরিয়ে নিলেন। তাঁর চোখ স্থির হলো সাদা কাগজের উপর, আর হাতের পেনটি নীরবে চলতে শুরু করল।
প্রথমে মনে হচ্ছিল, এ যেন কিছু অসংলগ্ন রেখা। এলোমেলো কিছু আঁচড়। কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই, কোনো স্পষ্টতা নেই। কিন্তু শিল্পীর চোখে তখন ছিল এক অদ্ভুত একাগ্রতা—যেন তিনি কাগজের উপর নয়, নিজের কল্পনার গভীরে আঁকছেন অন্য এক পৃথিবী।
ট্রেন তখন একের পর এক স্টেশন পার করছে। কখনও যাত্রী উঠছেন, কখনও নামছেন। হকারের গলায় ভেসে আসছে—“চা, কফি, চানাচুর…” কোথাও হাসির শব্দ, কোথাও ফোনে কথোপকথন, কোথাও আবার ক্লান্ত শরীরের নিঃশব্দ বিশ্রাম।
কিন্তু সেই সবকিছুর মাঝেও ওই মানুষটি যেন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। তাঁর হাত থামছে না। কখনও দ্রুত, কখনও ধীর, কখনও সূক্ষ্ম, কখনও গাঢ়—একটার পর একটা রেখা তৈরি করে চলেছে এক অদৃশ্য গল্প।
অজান্তেই আশপাশের কয়েকজন যাত্রীর চোখও গিয়ে থামে তাঁর হাতে।
আর তারপর…
চোখের সামনে যেন ঘটে যায় এক নীরব বিস্ময়।
সেই সাদা, সাধারণ, প্রায় ছেঁড়া কাগজের বুক চিরে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে এক অপূর্ব মৎসকন্যার প্রতিকৃতি। লম্বা চুলের ঢেউ, চোখের গভীরতা, মুখের কোমল অভিব্যক্তি, আর শরীরের সূক্ষ্ম রেখায় যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে কল্পলোকের এক চরিত্র।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল—এ কি সত্যিই লোকাল ট্রেনের কামরা? নাকি কোনো শিল্প প্রদর্শনীর নীরব গ্যালারি?
শিল্পীর হাত থামে না। শেষ কয়েকটি রেখা টেনে ছবিটিকে পূর্ণতা দেন তিনি। আর সেই মুহূর্তে চারপাশের কোলাহল যেন আর কানে পৌঁছয় না।
কৌতূহল আর বিস্ময় চেপে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কথা বলতে এগিয়ে গেলে তিনি মুখ তুলে তাকান। ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক মৃদু, নিরহংকার হাসি।
নাম জানতে চাইলে খুব সহজভাবেই বলেন—
“রায়জুলিয়াস… বাড়ি শিমুরালি।”
কথাগুলো ছিল খুব সাধারণ। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে ছিল এক গভীর শান্তি, এক অদ্ভুত স্থিরতা।
আরও কিছু কথা বলার আগেই ট্রেন ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে বাদকুল্লা স্টেশনে। স্টেশনের ঘোষণার শব্দ ভেসে আসে। দরজার সামনে ভিড় জমতে শুরু করে।
শিল্পী শান্তভাবেই নিজের কাগজ, পেন আর পুরনো ব্যাগ গুছিয়ে নেন। তারপর কোনো বাড়তি শব্দ না করে, কোনো পরিচিতি বা প্রশংসার প্রত্যাশা না রেখেই ধীর পায়ে নেমে যান প্ল্যাটফর্মে।
ট্রেন আবার চলতে শুরু করে।
জানলার বাইরে স্টেশন পিছিয়ে যায়, মানুষগুলো ছোট হয়ে যায়, দৃশ্য পাল্টাতে থাকে। কিন্তু কামরার ভেতরে থেকে যায় এক অদ্ভুত নীরবতা, এক গভীর অনুভূতি।
ফিরতি পথে বারবার শুধু একটাই কথা মনে হচ্ছিল—
শিল্প আসলে মঞ্চের অপেক্ষা করে না। শিল্প পরিচয়ের অপেক্ষা করে না। শিল্পের জন্য প্রয়োজন হয় না আলো, করতালি কিংবা দামি রঙ-তুলির।
শিল্প যদি সত্যিই হৃদয়ে বাস করে, তবে লোকাল ট্রেনের ভিড়ও হয়ে উঠতে পারে গ্যালারি, একটি পুরনো কাগজ হয়ে উঠতে পারে ক্যানভাস, আর কয়েকটি কালো রেখা সৃষ্টি করতে পারে এমন এক সৌন্দর্য—যা বহুদিন ধরে থেকে যায় স্মৃতির পাতায়।

Be the first to comment