বাংলা ভাষা নিয়ে প্রস্তাব, তুলকালাম বিধানসভায়

Spread the love

রোজদিন ডেস্ক : বাংলা ভাষার সম্মান রক্ষা, ভিন রাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর আক্রমণ নিয়ে শাসক দলের আনা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার শেষ দিনে তুলকালাম বাধে। একদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও অন্যদিকে  মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি-কে চোর তকমা দিয়ে শাসক ও বিজেপি বিধায়কদের নজিরবিহীন উচ্চধ্বনিতে মুখরিত হয় বিধানসভার অন্দর। সভায় বিশৃঙ্খলার দায়ে অধ্যক্ষ বিমান ব্যানার্জি একের পর এক বিজেপি বিধায়ককে সাসপেন্ড করেন। উভয় পক্ষের তুমুল চিৎকার, ধ্বস্তাধ্বস্তি-তে বিজেপির একাধিক বিধায়ক আহত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। প্রস্তাবের পক্ষে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলতে উঠলে উপস্থিত বিজেপি বিধায়করা তুমুল চিৎকার করে সমানে বাধা দেন। দৃশ্যত বিরক্ত মুখ্যমন্ত্রীও পালটা গলা চড়িয়ে আক্রমণ করেন প্রধানমন্ত্রী-সহ গোটা বিজেপি দলকেই। আবার তিনিই শাসক দলের বিধায়কদের শান্ত করতে নিজের বক্তব্য স্থগিত রেখে সভার ওয়েলে নেমে আসেন।

খোদ মুখ্যমন্ত্রীকে সভার ওয়েলে নেমে আসার ঘটনা অতীতে কখনো হয়েছে বলে কেউ মনে করতে পারেননি। বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাংলাভাষীদের নিগ্রহ নিয়ে মঙ্গলবার শাসক দল প্রস্তাব আনে। মেয়ো রোডে টিএমসি-র বাংলা ভাষা আন্দোলনের মঞ্চ সেনাবাহিনী খুলে দেওয়ার ঘটনা নিয়ে তেতে ছিলেন শাসক পক্ষ। প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাকালে এতে ঘৃতাহুতি দেন শিক্ষা মন্ত্রী ব্রাত্য বসু বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তাঁর তুমুল বিতন্ডা বাধে। সাসপেন্ড হন শুভেন্দু। এর প্রতিবাদে বিজেপি বিধায়করা আজ প্রথমার্ধে বয়কট করেন। দ্বিতীয়ারধে সভা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর তাঁরা আসেন। অগ্নিমিত্রা পাল তাঁর বক্তব্যে কেন বিরোধীনেতাকে সাসপেন্ড করা হল প্রশ্ন তোলেন। শাসক দল তাঁকে তুমুল বাধা দেন। প্রস্তাবের পক্ষে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলতে উঠলে বিজেপি বিধায়কদের তুমুল হট্টগোলে সভার অভ্যন্তর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শংকর ঘোষ-সহ একের পর এক বিধায়ককে সাসপেন্ড করেন অধ্যক্ষ।  মারমুখি শাসক ও বিজেপি বিধায়কদের পারস্পরিক বচসা বিতন্ডার মাঝে সুর চড়ান মুখ্যমন্ত্রীও। বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ করে বলেন, ওরা ভোট চোর, বিশ্বাসঘাতক। দেশের লজ্জা। বিজেপি বাংলা, বাংলা ভাষার মর্যাদা দেয় না। ওরা (স্বাধীনতার পর)  ক্ষমতায় থাকলে জনগণমন জাতীয় সংগীত হত না বলে তিনি মন্তব্য করেন। মুখ্যমন্ত্রী বক্তব্য রাখার সময় বিজেপি বিধায়করা চাকরি চোর মমতা ইত্যাদি বলে উচ্চ স্বরে ধ্বনি দেন। পালটা ক্ষুব্ধ  মুখ্যমন্ত্রীও উত্তেজিতভাবে বিজেপিকে ভোট চোর, সব থেকে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত, বাঙালি-বাংলা বিদ্বেষী, বিভাজনের কারিগর ইত্যাদি তকমা দেন।

বিজেপি কে তীব্র ধিক্কার ও আক্রমণ করে বলেন, ওরা সব থেকে বড় ভাঁওতাবাজ। মোদির সরকার, আর নেই দরকার বলে বেনজির  ধ্বনি দেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে ওরা ব্রিটিশদের স্তাবকতা করেছিল বলে ধিক্কার জানান। বলেন, ইংরেজের সঙ্গে চক্রান্ত করে ওরা ই ভারত-বাংলাকে ভাগ করেছিল।

ভোট এলেই বিজেপি এন আর সি ইত্যাদির ধুয়ো তোলে। আসলে ওরা  ডাবল স্ট্যান্ডার্ড,  কাউকে নাগরিকত্ব দেয়নি। নাগরিকত্ব দিলে তাদের সাংবিধানিক অধিকার দেওয়া হবে কিনা জানতে চান।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে একদিকে যখন বিজেপি বিধায়করা তুমুল বাধা দিচ্ছেন, পালটা গলা চড়িয়েছেন শাসক দলের অনেকেই, তাদের নাম ধরে সতর্ক করেন মুখ্যমন্ত্রী। জানিয়ে দেন, সভায় গোলমাল করলে শাসক বিরোধী কাউকেই রেয়াত করা হবে না। প্রয়োজনে সবাইকেই সাসপেন্ড করা হবে।

দুপক্ষের হই চই, চিৎকারের মাঝে এক সময় পড়ে যেতে দেখা যায় বিজেপির শংকর ঘোষকে। তাঁকে সতীর্থরা ধরাধরি করে সভার বাইরে নিয়ে যান।

মুখ্যমন্ত্রী এইদিন বিজেপি বিধায়কদের তীব্র আক্রমণ করে বলেন, তাকে দেখেই ওনারা সভায় এসেছেন। তাকে বিজেপি বিধায়করা  চাকরি চোর,  গদি ছোড় বললে রুদ্র মূর্তি ধরেন। নাম না করে প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করে বলেন, রাশিয়া,  চিন, আমেরিকা, ইস্রায়েলের পায়ে পড়ছে!  দেশ চালাবে কি ভাবে!!  নাম না করে বিরোধী নেতাকে ধিক্কার জানিয়ে বলেন, যে এখন বড় বড় কথা বলছে, সে চারবার দল পাল্টেছে। ইডি, সিবিআই থেকে বাঁচতে ওই দলে গেছে।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যর তীব্র প্রতিবাদে, দলীয় বিধায়কদের সাসপেন্ড, আহত হওয়া ইত্যাদির জেরে বিজেপি বিধায়করা সদলে সভা ছেড়ে চলে যান। মুখ্যমন্ত্রী তার নিজস্ব ভঙ্গিতে পরিস্কার জানান, তাঁরা রবীন্দ্রনাথ, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ,  নেতাজি প্রমুখের কথা থেকে কখনওই সরবেন না। বাংলা বললেই দেশ বিরোধী!!  মানুষ কখনো এই সব ক্ষমা করবে না বলে  হুংকার দেন। এইদিনটি বিধানসভার কালো দিন বলে মন্তব্য করেন।

আগামী বছর বিধানসভা ভোটে বিজেপি একটি আসনও পাবে না বলে হুশিয়ারি দিয়ে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় কবিগুরুর, বাঁধ ভেঙে দাও কবিতা আবৃত্তি করে দলীয় বিধায়কদের উজ্জীবিত করেন।

পরে অধ্যক্ষ বিমান ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী যে ভাবে বাংলা ভাষা নিয়ে প্রস্তাবে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন, এর জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*