পিয়ালি, কলকাতা :– দেশের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। রাজীব গান্ধী। ৩৪ বছর আগে আজকের দিনে প্রয়াত হন। ১৯৯১ সালের ২১ মে তামিলনাড়ুর কাঞ্চীপুরম জেলার শ্রী পেরুমবুদুরে জঙ্গিদের মানববোমায় হত্যা করা হয় তাঁকে।বয়স ছিল তাঁর তখন মাত্র ৪৬ বছর। একটি নির্বাচনী জনসভায় প্রচারের সময় হয় এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড। শ্রীলঙ্কায় শান্তি প্রচেষ্টায় ইন্ডিয়ান পিস কিপিং ফোর্স বা আইপিকেফ পাঠানোয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন LTTE এবং তার নেতা প্রভাকরণের কোপে পড়েন তিনি। সুযোগ বুঝে ঘৃণ্য আক্রমণ চালায় এলটিটিই। রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর দিনটি অ্যান্টি টেরারিজম ডে বা সন্ত্রাসবিরোধী দিবস হিসেবে পালিত হয়।
প্রসঙ্গত আজ ২০২৫ সালের ২১ মে সন্ত্রাস বিরোধী দিবসে ছত্রিশগড়ের নারায়নপুরে ২৬ জনেরও বেশি নকশাল উগ্রপন্থীদের এনকাউন্টার করা হয়। বিচ্ছিন্নতাবাদী উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে এটা একটি দৃঢ় পদক্ষেপ। অপারেশন ব্ল্যাক ফরেস্ট করে এই ভাবেই উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে নকশালদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিল সরকার।
ফিরে আসা যাক রাজীব গান্ধীর প্রসঙ্গে। ৩১অক্টোবর ১৯৮৪ মায়ের মৃত্যুর পর দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাজীব। রাজনীতির থেকে আকাশে প্লেন ওড়াতে বেশী ভালোবাসতেন রাজীব । ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের পাইলট ছিলেন তিনি। নীল আকাশে ডানা মেলতে দক্ষ রাজীবের মন ছিল আকাশের মতো বৃহৎ ,উদার. …
মাত্র ৪০ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় তাঁকে অনেকে অপরিণত বলতেন। কিন্তু দেশের যুবসমাজের উন্নয়ন, নারী ক্ষমতায়ন পঞ্চায়েতি রাজ -৩০ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণের চেষ্টা, ক্রেতা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ইত্যাদিতে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এই যে আমরা ডিজিটাল মিডিয়ায় কাজ করি, ভারতের ডিজিটাল মিডিয়া জগতের জনক বলা হয় রাজীব গান্ধীকে। তথ্য প্রযুক্তি এবং টেলিযোগাযোগ বিপ্লবের পুরোধা ছিলেন রাজীব। তাঁর বন্ধু শ্যাম পিত্রদাকে এনে রীতিমত সাড়া ফেলে দেন তিনি।
শাহবানু মামলা, রাম জন্মভূমি বাবরি মসজিদের তাঁর ভূমিকা নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়। কিন্তু আজ আমরা সন্ত্রাসবিরোধী দিবসে আলোচনা করব বিচ্ছিন্নতাবাদে বিরুদ্ধে তাঁর মতামত ও ভূমিকা নিয়ে।
১৯৮৯ সালের ১৫ই নভেম্বর ভোপালে একটি নির্বাচনী জনসভায় রাজীব বলেন, আমাদের প্রথম প্রতিশ্রুতি ছিল দেশের একতা ও অখন্ডতা। দেশে আতঙ্কবাদী শক্তি মাথা চাড়া দিচ্ছিল আমরা এক এক করে তাকে শেষ করছি পাঞ্জাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন এখানে বড় সমস্যা ছিল কিন্তু আমরা সন্ত্রাসবাদ দমনে যথেষ্ট সফলতা পেয়েছি। রাজীব তাঁর বক্তব্যে বলেন, পাঞ্জাবের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল দেশদ্রোহী শক্তিগুলোর মিলিত প্রয়াস যা আজ ব্যর্থ হয়েছে। দৃপ্তকণ্ঠে রাজীব বলেন সন্ত্রাসবাদ তবুও চলছে। একে আমরা মোকাবিলা করব ধরাশায়ী করব ,শেষ করব। রাজীব বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে পাঞ্জাবে আওয়াজ উঠতো, যে পাঞ্জাবকে ভারত থেকে আলাদা করতে হবে। বন্দুকের নলের নিচে অনেক কিছুই বাধ্য করা হতো। রাজীব বলে চলেন আজ পাঞ্জাব ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং কেউ তাঁকে আলাদা করতে পারবে না। এরপরেই আসে আসল প্রসঙ্গ রাজীব গান্ধী বলেন পাঞ্জাবকে আলাদা করে দেয়ার যে চেষ্টা তা আসলে একটা বড় চক্রান্ত ছিল। কিন্তু এই আতঙ্কবাদ শুরু আমাদের দেশ থেকে নয় এই আন্দোলন এই সন্ত্রাসবাদের শিকড় প্রোথিত আছে অন্য কোথাও নয় ,পাকিস্তানে। দেশে এবং দেশের বাইরে এই আন্দোলন এই আতঙ্কবাদকে লালন করে পাকিস্তান । তাদের সমর্থনের ফলেই পাঞ্জাবে মাথা চারা দেয় উগ্রপন্থা। আর যদি আমরা গত ১০/ ১১ বছরে পাঞ্জাবের আন্দোলনকে দেখি, একটা কথা স্পষ্ট হয়, প্রত্যেক বিষয়ে প্রত্যেক মুহূর্তে প্রতি পদক্ষেপে পাঞ্জাবের আন্দোলনকে সহায়তা করেছে পাকিস্তান। কখনো সন্ত্রাসবাদীদের ট্রেনিং দিয়েছে ,কখনও তাদের আমাদের দেশে পাঠিয়েছে, কখনো না বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সন্ত্রাসবাদিদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে পাকিস্তান।।এটা কোন সাধারন আন্দোলন নয়। রাজীব বলে চলেন ,অনেক হিসাব-নিকাশ করে ভারতকে ভাঙার জন্য তৈরি হয়েছে পাকিস্তান ।কিন্তু আজ আমরা গর্বের সঙ্গে বলি এর মোকাবিলা করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। এবং এই ভারত ভাঙার চক্রান্ত সফল হয়নি ,আমরা করতে দিইনি এবং অচিরেই তাদের সমস্ত চক্রান্ত আমরা ব্যর্থ করে দেব। আমরা এর পুরো মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।
ছত্রিশ বছর আগের এই বক্তব্য আজও কতটা প্রাসঙ্গিক এর থেকেই বোঝা যায়। দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন রাজীব গান্ধী। আজ তাঁর মৃত্যু দিবসে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সঙ্গতভাবেই দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী বলে উল্লেখ করেন।
অপারেশন সিঁদুরের পর প্রধানমন্ত্রী মোদির বক্তব্য তাঁর জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণের মূল বক্তব্য ১৯৮৯ সালের রাজীব গান্ধীর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে করা মন্তব্যের সঙ্গে প্রায় মিলে যায়।
দুজনেই পাকিস্তানকে সন্ত্রাসের প্রশ্রয়দাতা শুধু নয়, বিশ্ব সন্ত্রাসের কেন্দ্রভূমি বলে উল্লেখ করেছেন।
পহেলগাঁও তে পর্যটক হত্যার ক্ষত এখনো শুকোয়নি আমাদের । সবে তো এক মাস হল। এই হত্যাকাণ্ডের পর অপারেশন সিঁদুর করেছে ভারত সরকার আর তারপর জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণের পরতে পরতে কাশ্মীর সমস্যার জন্য পাকিস্তান কে দায়ী করেন মোদী।১২ মে বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন স্পষ্ট করে দেন মোদী, রক্ত জল একসঙ্গে বইতে পারে না তিনি পাকিস্তানের মুরিদ আর বাওয়ালপুরকে সন্ত্রাসের বিশ্ববিদ্যালয় বলে উল্লেখ করেন। এবং ৯ /১১ ,২৬/১১ ,লন্ডন টিউব হামলা ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের মূলে যে পাকিস্তান সেকথাও স্পষ্ট করে দেন দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদী। কাশ্মীর যে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং পাকিস্তানের সঙ্গে কথা হলে সন্ত্রাস দূরীকরণ ও পাক অধিকৃত কাশ্মীর নিয়ে কথা হবে একথাও বলেন তিনি। রীতিমত হুংকার ছাড়েন মোদী।প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদীর দুই রাষ্ট্রনায়কই বিদেশী, তৃতীয় শক্তির হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন।
কিন্তু সন্ত্রাসবাদের হানা আজও বন্ধ করা যায়নি। তাই তো ২১-৫-৯১তে রাজীব গান্ধীকে আত্ম বলিদান দিতে হয়, অন্যদিকে ২২ /৪/২৫ এ পহেল গ্রামের ২৬ জনকে বিচ্ছিন্নতাবাদ এর শিকার হতে হয়। তবে রাজীব গান্ধী যেমন পাঞ্জাব কে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করার পাক চক্রান্ত ভেস্তে দেওয়ার কথা বলেছিলেন এবং তা সত্যিই হয়েছে ,আমরাও আশা রাখি কাশ্মীর আমাদের ভারত মাতার সোনার মুকুটের সবচেয়ে উজ্জ্বল মনি হিসেবে চিরকাল দ্যুতি ছড়াবে।

Be the first to comment