তপন মল্লিক চৌধুরী ।।
আপামর বাঙালি সিনেমাপ্রেমীদের কাছে ২৪ জুলাই দিনটি বিষণ্ণতার প্রতীক হলেও কিন্তু ৩রা সেপ্টেম্বর মহানায়ক উত্তমকুমারের জন্মদিনটি সেভাবে স্মরণ করা হয় না। কেন করা হয় না এর উত্তর পাইনি। নানা মঞ্চে নানা ভাবে তাঁকে যেমন স্মরণ করা হয়, সেই স্মরণ কখনও আদিখ্যেতা বলেও মনে হয়, পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্ন আজও মনে হয়; এলিট বাঙালি কী উত্তমকুমারকে তাঁর যোগ্য সম্মান দিয়েছে, বাম বুদ্ধিজীবীদের আলোচনায় কী উত্তমকুমার সেভাবে জায়গা পেয়েছেন? না, বরং উত্তমকুমার ঠিক এই জায়গায় অনেকটাই ব্রাত্য। তাঁর বিষয়ে বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা বরাবর যেন উদাসীন। সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘নায়ক’(১৯৬৬)-এ আসল উত্তমকুমারকে স্টারডমের বাইরে ফুটিয়ে তুলেছিলেন ঠিকই কিন্তু ‘নায়ক’ আর ‘চিড়িয়াখানার’(১৯৬৭)-র পর সত্যজিৎ-উত্তম জুটিকে আর একসঙ্গে দেখা যায়নি। সুচিত্রা সেনকে নিয়ে সত্যজিৎ দেবী চৌধুরানী ভেবেছিলেন, কিন্তু শ্রীমতী সেন রাজি হননি। সুচিত্রা সেনকে নিয়ে ঋত্বিক ঘটকও ছবি করার কথা ভেবেছিলেন। এমনকি উত্তমকুমারকে নিয়েও ঋত্বিক ছবির কথা ভেবেছিলেন। যদিও ঋত্বিকের বহু ছবির কাজ মাঝপথে থেমে গিয়েছিল। বহু ছবির চিত্রনাট্য লেখা শেষ হলেও কাজ শুরু হয়নি। তবে উত্তমকুমারকে নিয়ে ঋত্বিক নির্দিষ্টভাবে কোনো ছবির কথা ভেবেছিলেন বলে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তাঁদের দু-জনের মধ্যে যে সখ্যতা ছিল সেকথা অনেকেই জানেন। একবার টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে শুটিংয়ের মধ্যেই মহানায়ক খবর পান যে, ঋত্বিক ঘটক অসুস্থ অবস্থায় নার্সিংহোমে ভর্তি হয়েছেন। এর কিছুদিন পরই ঋত্বিক ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবির শুটিং শুরু করবেন। মহানায়ক শ্যুটিং থামিয়েই ছুটেছিলেন ঋত্বিক ঘটককে দেখতে। তখন দিনেরবেলায় কলকাতার নার্সিংহোমে যাওয়াটা মহানায়কের পক্ষে বেশ ঝুঁকির কাজ ছিল, তা স্বত্বেও তিনি ছুটে গিয়েছিলেন।
এই ঘটনার আগেও বেশ কয়েকবার উত্তমকুমারের সঙ্গে ঋত্বিক ঘটকের দেখা হয়েছে এনটি-ওয়ান স্টুডিওর ক্যান্টিনের সামনে। যতবার তাঁদের সাক্ষাৎ হয়েছে প্রত্যেকবারই ঋত্বিকের সেই এক কথা, “উত্তম আমি একটা ছবি করছি, তুমি হবে তাঁর হিরো, করবে তো? অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে উত্তমকুমার একটাই জবাব দিতেন, ‘এ কথা তো রোজই বলেন আপনি, যেদিন খুশি শুরু করুন, আপনার জন্য আমার সময়ের অভাব হবে না’। নার্সিংহোমে শুয়েও উত্তমকে দেখে ঋত্বিকের সেই কথাটাই নাকি বলেছিলেন। সেরে উঠেই তোমাকে নিয়ে সেই ছবিটা বানাবো। উত্তমকুমার সেই পুরনো কথা শুনে সেদিনও হেসে বলেছিলেন, ‘সে দেখা যাবে, আগে আপনি সেরে উঠুন’। জানা যায় মহানায়ক মনে মনে পরিকল্পনা করেছিলেন যে ‘বনপলাশীর পদাবলী’ ছবিটি তিনি ঋত্বিক ঘটককে দিয়েই করাবেন, সেই প্রস্তাব ঋত্বিক ঘটকের কাছে পেশও করেছিলেন, ঋত্বিক নারাজ হন নি। আসলে সেই সময় ঋত্বিকের টাকার খুব দরকার ছিল। শোনা যায় উত্তমকুমার এর জন্য ঋত্বিককে কিছু টাকা অগ্রিম দিয়েছিলেন। এরপর ঋত্বিক খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন, উত্তমকুমার বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করেন কিন্তু ঋত্বিক আর সেরে উঠতে পারেননি।
উত্তমকুমারকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁর সময় এমনকি পরবর্তীতেও বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের আলাপ-আলোচনায় অবজ্ঞা বা অবহেলার অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে। এমনটা বলা যায় কারণ, তিনি মূলত বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করতেন এবং তাঁর অভিনয়শৈলীকে অধিকাংশ সিনেমা-বোদ্ধা বা আলোচকরা গভীর শিল্পমূল্য থেকে দূরে বলে মনে করতেন। বস্তুত উত্তমকুমার বাণিজ্যিক, রোমান্টিক ছবির জন্য সবিশেষ পরিচিত ছিলেন, যে ধরনের ছবিকে অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী শিল্পগতভাবে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় বলেই মনে করেন। অন্যদিকে ভাবখানা এমন যেন বামপন্থী বা শিল্প-সচেতন বুদ্ধিজীবীদের সমর্থন মেলে একমাত্র সামাজিক বা শিল্পসম্মত ছবির ক্ষেত্র থেকে। তার উপর উত্তমকুমারের বিপুল জনপ্রিয়তা ও বাণিজ্যিক সাফল্যও তাঁকে বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল, কারণ উত্তমকুমার ‘নায়ক’ ছবিতে অসাধারণ অভিনয়ের পরও কিন্তু বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা তাঁকে একজন প্রকৃত অভিনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আগ্রহী ছিলেন না। একদিকে বাণিজ্যিক সিনেমার প্রতি সাধারণ দর্শকদের আকর্ষণ অন্যদিকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব; বামপন্থী বা শিল্প-সচেতন বুদ্ধিজীবী মহলে উত্তমকুমারের তেমন গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। তাঁদের মতে, শিল্প হতে হবে সামাজিক বার্তার বাহক এবং এর একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা আদর্শগত অবস্থান থাকতে হবে, যা উত্তমকুমারের ছিলো না, যদিও উত্তমকুমার ‘নায়ক’ ছবির মতো শিল্পসম্মত ছবি ছাড়াও বহু ছবিতেই তাঁর অভিনয় প্রতিভার সাক্ষর রেখেছিলেন কিন্তু তাহলেও বাঙালি বুদ্ধিজীবী তাঁকে একজন একজন প্রকৃত অভিনেতা হিসেবে নয়, ‘নায়ক’ হিসেবেই দেখতেন। তাঁরা উত্তমকুমারকে একটি নির্দিষ্ট ধারার সিনেমার প্রতি অতিরিক্ত অনুরাগী বলেই মনে করতেন। এর ফলে, যারা শিল্প-সচেতন তারাও তাঁকে দক্ষ অভিনেতা বলে গ্রহণ করতে পারেননি। তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই বেশি ছিল যে, সাধারণ মানুষ তাকে ‘মহানায়ক’ হিসেবে দেখতেন, কিন্তু সিনেমা সমালোচকরা তাঁকে সেই উচ্চতায় বসাতে পারেন নি। এসব কারণেই মনে হয় উত্তমকুমার শিল্পী হিসাবে, অভিনেতা হিসাবে আমাদের বুদ্ধিজীবী মহলের থেকে চূড়ান্ত অবহেলা এবং অবিচার পেয়েছেন।

Be the first to comment