তরুণ ভোটাররাই কী এবার বিহার নির্বাচনের ফলাফল ঠিক করবে

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী :

এবার বিহার ভোটের ফলাফল নির্ধারণে তরুণ ভোটারদের ভূমিকা কি হতে পারে সে বিষয়ে ধারণা স্পষ্ট করতে শুরুতেই ২০১১ সালের আদমশুমারি পরিসংখ্যানে চোখ বোলানো যেতে পারে। যে পরিসংখ্যানের হিসাব অনুসারে এবার বিহারের জনসংখ্যার ৫৮% এরও বেশি ২৫ বছরের কম বয়সী এবং ২০২৫ সালে বিহারের জনসংখ্যার প্রায় ৪০% ভোটারের বয়স ১৮-২৯ বছর। এই হিসাবকে কেবল একটি পরিসংখ্যান ভাবা ঠিক হবে না, কারণ এই হিসাব ভোটের ফলাফলে একটি জোয়ারের ঢেউ হয়ে উঠতে পারে। ২০২০ সালে বিহার নির্বাচনে তরুণদের ভোট দেওয়ার হার ছিল প্রায় ৫৫%, যা সেই রাজ্যের গড় ৫৭.০৫% এর চেয়ে সামান্য কম, তবে তাদের প্রভাব ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বিহারের মতো বেকারত্ব এবং অভিবাসনের মতো যে সমস্যা তা ভোটের লড়াইতে নামা রাজনৈতিক দলগুলি তাদের পক্ষে ভোট চাইতে গিয়ে উল্লেখ করতে বাধ্য হয়েছিল। এবারও বিহার বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০% ১৮-২৯ বছর বয়সী তরুণ, যে কারণে বিহারের যুবসমাজ ২০২৫ সালের নির্বাচনকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারে বলে ভোট বিশেষঙ্গরা মনে করছেন।

বিহারের যুবসমাজ কিংবা নতুন ভোটাররা কি চাইছেন? তারা কি এবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট বা এনডিএ-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন, নাকি জনতা দল (ইউনাইটেড), রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) অথবা কংগ্রেসের মহাজোটয়ের কথা চিন্তা করছেন? গত নির্বাচনের থেকে ২০২৫ সালের গতিপ্রকৃতি অনেক বেশি দ্রুতগতিসম্পন্ন এবং যুবসমাজও আগের চেয়েও সেই গতিপ্রকৃতির সঙ্গে অনেক বেশি সংযুক্ত। এখন প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতেও ৪জি নেটওয়ার্ক পৌঁছে যাওয়ার এবং তুলনামূলক সস্তা ডেটা প্ল্যানের মাধ্যমে, বিহারের ৬০% এরও বেশি তরুণ ভোটার হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব এবং অন্যান্য নানা প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়। তারা যে কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতা অবজ্ঞাভরে শুনছেন তাই নয়, তারা তর্ক করছে, মিম-ইং করছে এবং জবাবদিহিতাও দাবি করছে। সাম্প্রতিক একটি এক্স পোস্টে যার সারসংক্ষেপ তুলে বলা হয়েছে: “বিহারের যুবকরা আর ঘুমাচ্ছে না। তারা চাকরি চায়, ঝুমলা নয়।” মনেটা যে খুব স্পষ্ট সেকথা আর বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। শুধু এটুকু বলাই যথেষ্ট যে চাকরি, শিক্ষা এবং সংযোগ বিষয়ে বিহারের তরুণরা কেবল কথাবার্তাতেই প্রভাবিত নয়। চাকরি, শিক্ষা এবং ডিজিটাল সংযোগ- তাদের স্পষ্ট অগ্রাধিকার। যে রাজ্যে ২০% এরও বেশি যুবক বেকার, এবং লক্ষ লক্ষ লোক কাজের সন্ধানে দিল্লি এবং মুম্বাইয়ের মতো শহরে পাড়ি জমায় সে রাজ্যে বেকারত্ব যে রক্তক্ষরণের চেয়ে বেশি ক্ষত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর সেই কারণেই বিহারের যুব সমাজ আর জাতপাত নিয়ে চিন্তা করেন না। তারা আগে চাকরির সুযোগ কোথায় কি দেখতে চায়, তারপর ভোটের কথা…।

বিহারে এবার ভোটে ১৮-১৯ বছর বয়সি ১৪.১ লক্ষ ভোটার ২৪৩টি বিধানসভা আসনে প্রথমবার ভোট দেবেন। অনেকে মনে করছেন, নতুন ভোটাররাই এবারের ভোট ব্যাঙ্কে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। হিসাব বলছে প্রতিটি আসনে এবার গড়ে ৫ হাজার ৭৬৫ জন তরুণ প্রথম ভোট দেবেন। ২০২০ সালে যেখানে নতুন ভোটার ছিল ১১.১৭ লক্ষ সেখানে এবার নতুন ভোটার প্রায় কাছাকাছি ৩ লক্ষ বেড়েছে। যদিও ২০১৫ সালের তুলনায় অনেকটা কম। ২০২০ সালের ভোটে ছিল ৫৬টি আসন। জয়ের গড় ব্যবধান ছিল ১৬ হাজার ৮২৫টি ভোট। অন্য দিকে, ২০১৫ সালে নতুন ভোটারের সংখ্যা ছিল ২৪.১৩ লক্ষ। সে বছর প্রথমবার ভোটদাতাদের গড় সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৯৩০টি। সেই সময়ে লড়াই হয়েছিল ৭৩টি আসনে। ভোট বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিহারে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেহেতু ক্রমশ বাড়ছে উল্টোদিকে জয়ের যেহেতু ব্যবধান কমছে, তাই এটা বলা যায় যে ১৪.১ লক্ষ নতুন ভোটার ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে যা সিদ্ধান্ত নেবেন তার অনেকটা প্রভাব ভোটের ফলাফলে পড়বে। তাই রাজনৈতিক দলগুলির সর্বাত্মক চেষ্টা রয়েছে যাতে এ বার তরুণ ভোটারদের সমর্থন আদায় করতে পারে। বিহারের শিক্ষা ব্যবস্থা যে মানেরই হোক সাক্ষরতার হার ৭০.৯%। তরুণরা আরও ভালো কলেজ, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার কোচিং-এর সুযোগ চায়। তরুণ ভোটাররা পড়াশোনা, কাজ এবং সংযুক্ত থাকার জন্য নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট চান। ভোটের লড়াইতে দলগুলি তাদের ইশতেহারে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই জোন এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তরুণ ভোটারদের দিকে তাকিয়েই বিহারে এবার ভোটের ইশতেহার যুব-কেন্দ্রিক। বিজেপির “ডিজিটাল বিহার ২০৩০” পাটনা এবং ভাগলপুরে প্রযুক্তি কেন্দ্র স্থাপনের প্রতিশ্রুতি। আরজেডি ইউপিএসসি এবং বিপিএসসি পরীক্ষার জন্য বিনামূল্যে কোচিং দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে। জন সুরাজের “১০ লক্ষ রোজগার” পরিকল্পনা ক্ষুদ্র-উদ্যোগের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে। সব প্রতিশ্রুতি তরুণদের আকর্ষণ করতে। কিন্তু এই প্রচার কি সত্যি তরুণদের আকৃষ্ট করছে? যুব ভোটই তার সিদ্ধান্ত নেবে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*