রমিত সরকার :
নদীয়া জেলার শান্তিপুরের নতুনহাটের নিকটে, ডাবরে পাড়া লেনের এক শান্ত, নির্জন প্রান্তে অবস্থিত “নতুনহাট গোস্বামী বাটি (নন্দালয়)”—যা আজও বহন করে চলেছে ভক্তি, ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের এক জীবন্ত প্রতীক। বহু প্রজন্ম ধরে এই পরিবারের কূলদেবতা শ্রীশ্রী রাধা মদন গোপাল জিউ, যাঁদের যুগলমূর্তি শিল্প, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য সংমিশ্রণ।
কষ্টিপাথরে নির্মিত শ্রীমদন গোপাল ও অষ্টধাতু নির্মিত শ্রীমতি রাধিকার মূর্তি শুধু প্রাচীনই নয়, শিল্পকলার দিক থেকেও অসাধারণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, এই শ্রীবিগ্রহ একসময় শ্রীঅদ্বৈত আচার্যের সান্নিধ্য প্রাপ্ত—এমনকি তাঁরই দ্বারা পূজিত ও সেবিত হয়েছিলেন।
ইতিহাস বলছে, শান্তিপুরের নাথ বেদ পুরন্দর বেদ পঞ্চানন কমলক্ষ মিশ্রের সময় বা শ্রীঅদ্বৈত আচার্যের যুগেই বৃন্দাবনের শ্রীকুঞ্জ তথা শ্রীরাধিকা কুঞ্জ থেকে এই শ্রীবিগ্রহ আনা হয়। পরে প্রভুপাদ অদ্বৈত আচার্যের পুত্র শ্রীকৃষ্ণ মিশ্রের বংশধরগণ, অর্থাৎ বর্তমান নতুনহাট গোস্বামী পরিবারের পূর্বপুরুষরা, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই বিগ্রহের সেবাপূজা অব্যাহত রাখেন।
অদ্বৈত পরিবারভুক্ত নন্দকিশোর গোস্বামী ও নদীয়ার বিনোদ গোস্বামী পরিবার এই ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হিসেবে পরিচিত। জানা যায়, বিশেষ কিছু ঐতিহাসিক কারণে নন্দকিশোর গোস্বামী একসময় পরিবারসহ পূর্ববঙ্গে পাড়ি দেন, এবং দীর্ঘদিন সেখানে শ্রীবিগ্রহের সেবা চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৪৬–৪৭ সালের দেশভাগের অস্থির সময়ে তাঁর উত্তরসূরি নন্দগোপাল গোস্বামী শ্রীবিগ্রহসহ পুনরায় শান্তিপুরে ফিরে আসেন এবং নতুনহাটের নিকটে বর্তমান স্থানে আশ্রয় নেন।
তবে সেই সময়ের অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি শ্রীবিগ্রহকে সাময়িকভাবে নবদ্বীপের সমাজবাড়ি সংলগ্ন নৃসিংহ দেব মন্দিরে সংরক্ষণে রাখেন। প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে, বর্তমান প্রজন্ম সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনেন—শ্রীবিগ্রহ পুনরায় শান্তিপুরে এনে প্রতিষ্ঠা করা হয় “নন্দালয়”-এ, নতুন আঙ্গিকে কিন্তু প্রাচীন রীতিনীতির প্রতি অটল থেকে।
আজও এই শ্রীবিগ্রহের নিত্য সেবা, ভোগ, আরতি ও পূজা একই ভক্তি ও নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন হয়। প্রতিবছর রাস পূর্ণিমার তিথিতে গোস্বামী বাটি জ্বলে ওঠে এক ভক্তিময় আলোকোজ্জ্বলতায়। দূরদূরান্ত থেকে আগত ভক্তবৃন্দ এদিন এসে ধন্য হন শ্রীশ্রী রাধা মদন গোপাল জিউর দর্শনে।
পাঁচ শতাধিক বছর অতিক্রম করেও “নতুনহাট গোস্বামী বাটি নন্দালয়” কেবল একটি পারিবারিক দেবালয় নয়—এটি শান্তিপুরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ, নদীয়ার ভক্তি-আন্দোলনের ইতিহাসে এক জীবন্ত অধ্যায়।
আজও এখানে মিশে আছে ইতিহাসের স্মৃতি, ভক্তির অনুরণন, আর উত্তরাধিকারের দীপ্তি—যা প্রমাণ করে, ঐতিহ্য কখনও হারায় না, শুধু রূপ বদলে টিকে থাকে ভক্তির আলোয়।

Be the first to comment