নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: মাত্র তিন মাস বয়স। দুধের গন্ধটাও এখনো মায়ের দেহে শুকোয়নি, এমন সময়ই মাকে হারাল দুই যমজ শিশু। মায়ের স্নেহ, কোলে মাথা রাখা, সেই আশ্রয়—কিছুই বোঝার আগেই নিঃসঙ্গতার পৃথিবীতে ঠেলে দেওয়া হল ওদের। আরও নির্মম, বাবা-ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। বলেছেন, আর্থিকভাবে সম্ভব নয় সন্তান দু’টিকে মানুষ করা। ফলে শেষমেশ সরকারি হোমই হয়ে উঠল এই ছোট্ট প্রাণ দু’টির নতুন ঠিকানা।
ঘটনাটি কৃষ্ণনগর কোতোয়ালি থানার সুবর্ণবিহার এলাকার। স্থানীয়রা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না—একসঙ্গে এমন দুই আঘাত! মা নেই, আর যিনি আছেন, তিনি দায় এড়িয়ে গেছেন। কন্যাসন্তান বলেই কি কেউ দায়িত্ব নিতে চাইল না? এই প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে পুরো পাড়ায়।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃতা গঙ্গা লোহার, বয়স বছর কুড়ি। বাপেরবাড়ি হুগলির মগরায়। প্রেম করে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন গাড়িচালক সমর লোহারকে—হুগলিরই পাণ্ডুয়া এলাকার বাসিন্দা। বছর দেড়েক আগে বিয়ের পর কৃষ্ণনগরের সুবর্ণবিহারে ভাড়া বাড়ি নিয়ে সংসার শুরু করেন দু’জনে। সংসারে নবজীবনের আলো এসেছিল মাত্র তিন মাস আগে—দুই যমজ কন্যা জন্ম নেয়।
কিন্তু সোমবার গভীর রাতে ঘরে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হয় গঙ্গার দেহ। প্রতিবেশীরা খবর দেন পুলিশে। কোতোয়ালি থানার পুলিশ গিয়ে দেহ উদ্ধার করে শক্তিনগর জেলা হাসপাতালে পাঠায় ময়নাতদন্তের জন্য। প্রাথমিকভাবে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু হয়েছে, তবে কেন গঙ্গা আত্মহত্যা করলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তার পরিবারের তরফে কোনও লিখিত অভিযোগও করা হয়নি। আরও বেদনাদায়ক, ময়নাতদন্তের পর দেহ নিতে পর্যন্ত কেউ আসেননি।
এরপর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জানা যায়, সমর ও তাঁর পরিবার জানিয়ে দিয়েছেন—তাঁরা ওই দুই শিশুকে নিজেদের কাছে রাখবেন না। পুলিশ ও চাইল্ড লাইনের আধিকারিকরা তখনই ওই বাড়িতে পৌঁছন। সমরের বক্তব্য, আর্থিক অনটনের কারণে দুই সন্তানকে মানুষ করা সম্ভব নয়। আত্মীয়স্বজনরাও দায়িত্ব নিতে রাজি নন। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের উদ্যোগে দুই শিশুকন্যাকে রানাঘাটের সরকারি হোমে নিয়ে যাওয়া হয়।
এক পুলিশ আধিকারিক জানান, “মায়ের মৃত্যুর পর বাবাই জানিয়ে দেন তিনি সন্তানদের রাখতে পারবেন না। তাই চাইল্ড লাইনের সহযোগিতায় আমরা শিশু দু’টিকে সরকারি হোমে পাঠাই।”
শিশু কল্যাণ সমিতির (সিডব্লুসি) চেয়ারপার্সন টিয়া বিশ্বাস বলেন, “দুই শিশুকন্যাকে আপাতত রানাঘাটের সরকারি হোমে রাখা হয়েছে। তাদের যত্নে কোনও খামতি রাখা হবে না। পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নিয়মমতো নেওয়া হবে।”
এলাকার এক প্রতিবেশী আক্ষেপ করে বললেন, “আজ দেশের মেয়েরা ক্রিকেট মাঠে বিশ্বকাপ জিতে গর্বের জায়গায় দাঁড়াচ্ছে, আর এখানেই মাতৃহারা দুই কন্যার দায়িত্ব নিতে চায় না কেউ—এটা ভাবতেও কষ্ট হয়।”
একটা মায়ের হারানোর গল্পের সঙ্গে জুড়ে গেল সমাজের নীরবতা। প্রশ্ন রয়ে গেল—এই দুই ছোট্ট জীবনের অপরাধটা কী? যে কেবল মেয়েসন্তান হয়ে জন্মেছে?

Be the first to comment