নীতিশ কুমার কী জ্যোতি বসুর রেকর্ড ছুঁতে পারবেন?

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী : 
তখন লালু রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা বলতে একেবারে কিছুই নেই। বিহার বলতে সবদিক থেকে তলানিতে থাকা একটা রাজ্য। ২০০৫ সালে সেই অপশাসনের পট পরিবর্তন হয়। ক্ষমতার বদল একইসঙ্গে প্রথমবারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নীতীশ কুমার বিহার প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়েছিলেন। রাস্তা-ঘাট থেকে থেকে স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল থেকে প্রায় সর্বত্র সুশাসন ফেরাতে তিনি যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তা অধিকাংশই কার্যকর হয়েছিল। সেই সাফল্যের কারণেই তিনি দু’শতক বিহারের সিংহাসনে বিরাজ করেছেন। তাই নীতিশ কুমারকে বিহার রাজনীতির ওই পর্বের হার্ট লাইন বললে অত্যুক্তি করা হবে না। বিহার বললে ভারতবাসীর মনে যে ছবি ফুটে উঠত নীতিশ কুমার তাঁর একের পর এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে বিহারের সেই পরিচয়কে অনেকটাই মুছে ফেলতে সমর্থ হয়েছিলেন। তবু বিহারের রাজনীতিতে তাঁর নাম হিরো বা ভিলেন হিসাবে ফুটে উঠেছে। রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ঝোলায় তিনি সুনাম থেকে দুর্নাম দুই ভরেছেন। তবে রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কৌশলের ক্ষেত্রে তাঁর একের পর এক চমকদার সিদ্ধান্ত তাঁকে বিহারের রাজনীতিতে যেমন জনপ্রিয় করেছে অন্যদিকে গোটা দেশেই তাঁর তৈরি করা প্রকল্প, ভোট রাজনীতির পরিসংখ্যানকে অনেক ক্ষেত্রে পাল্টে দিয়েছে। শাসক হোক বা বিরোধী, সমস্ত রাজ্যই তাঁর তৈরি করা প্রকল্প গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে। অথচ সময়ের অদ্ভুত খেলায় তিনি অভিযুক্ত হচ্ছেন ক্লান্ত ও বিভ্রান্ত শাসক হিসেবে। তা স্বত্বেও বিহারের এবারের নির্বাচনেও তাঁর মাস্টারস্ট্রোক, মহিলাদের অ্যাকাউন্টে ১০ হাজার টাকা। তাই বিহারের সাধারণ মানুষ তাঁর সমালোচনা করুন বা সমর্থন জানান, নীতিশের নাম কিন্তু ভুলে যাননি বরং একটি নামই সবার মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তিনিই কি ফের বিহার তখতের দখল নেবেন? টানা পাঁচবার মুখ্যমন্ত্রী- ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এমন নজির গড়েছিলেন জ্যোতি বসু বাংলায়। ১৯৭৭ থেকে পরপর পাঁচবার বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেছিলেন। বিহারে ফের এনডিএ-র জয় হলে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসবেন নীতীশ কুমার। এর অর্থ টানা পাঁচবার মুখ্যমন্ত্রী হয়ে জ্যোতি বসুর নজির ছুঁয়ে ফেলবেন তিনি। তবে জোট গড়ে ও ভেঙে ২০০৫ থেকে ২০২০ পর্যন্ত সাতবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন নীতীশ কুমার।
বিহার বিধানসভা নির্বাচনের শেষ দফায় ভোট পড়েছে ৬৮.৮১ শতাংশ। আর দু’দফা মিলিয়ে ভোট শতাংশের পরিমাণ ৬৬.৯০। বিহারে বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটদান শেষ হওয়ার পরেই প্রকাশিত হয়েছে প্রথম এক্সিট পোলের ফলাফল। সমীক্ষা অনুযায়ী, বিহারের রাজনীতিতে এবার নীতিশ কুমার নেতৃত্বাধীন এনডিএ এবং তেজস্বী যাদব নেতৃত্বাধীন মহাগঠবন্ধনের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে। সমীক্ষা অনুযায়ী, ভোটের পরিপ্রেক্ষিতে এনডিএ জোট পেতে পারে প্রায় ৪৩ শতাংশ ভোট, উলটোদিকে ৪১ শতাংশ ভোট পেতে পারে মহাগঠবন্ধন। এ ছাড়া প্রশান্ত কিশোরের জনসুরজ জোট পেতে পারে ৪ শতাংশ, এবং অন্যান্য দলগুলির দখলে যেতে পারে প্রায় ১২ শতাংশ ভোট। পরের প্রশ্ন মুখ্যমন্ত্রী পদে কে জনপ্রিয়? সমীক্ষা নেওয়া ৩৪ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন তেজস্বী যাদব, ২২ শতাংশ ভোটার বলেছেন নীতিশ কুমার, বাকি ভোটাররা মত দিয়েছেন অনির্দিষ্টভাবে। এই সমীক্ষা থেকে এটুকু বুঝতে অসুবিধ হচ্ছে না যে মুখ্যমন্ত্রী পদে তেজস্বীর জনপ্রিয়তা নীতিশের চেয়ে এই মুহুর্তে বেশি। পাশাপাশি বিহার বিধানসভা নির্বাচনের দুই পর্বের ভোটদান শেষ হতেই একাধিক এক্সিট পোলের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। সেই সমীক্ষার প্রায় সবকটি বলছে, বিহারে আবার ক্ষমতায় আসতে চলেছে এনডিএ। তার মানে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে ফের বসতে চলেছেন জেডিইউ নেতা নীতীশ কুমার। তার মানে আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদবের মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং এক্সিট পোল অনুযায়ী, তেজস্বীর নেতৃত্বাধীন মহাগঠবন্ধন বেশ কিছু আসনে জোড় লড়াই দিয়েছে, তবু এনডিএ-র সঙ্ঘবদ্ধ প্রচার, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপস্থিতি এবং অবশ্যই মহিলা ভোটারদের মধ্যে নীতীশ কুমারের জনপ্রিয়তা এবারের নির্বাচনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। এক্সিট পোল-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, বিহারে এনডিএ জিততে পারে ১৩০ থেকে ১৩৫টি আসন, আর মহাগঠবন্ধন পেতে পারে ১০০ থেকে ১০৮টি আসন। অধিকাংশ এক্সিট পোল বলছে, এনডিএ পেতে পারে ১৪৫ থেকে ১৬০টি আসন, মহাগঠবন্ধনের ঝুলিতে যেতে পারে ৭৩ থেকে ৯১টি আসন। অন্যদিকে প্রশান্ত কিশোরের জন সুরাজ-এর খাতা খোলা নিয়েই সংশয় দেখা দিয়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, তারা সর্বাধিক তিনটি আসনে জয় পেতে পারে। সব মিলিয়ে, এক্সিট পোলের সমীক্ষায় স্পষ্ট যে বিহারে নীতিশ কুমারের প্রত্যাবর্তন ঘটতে চলেছে। আর তেজস্বী যাদবকে মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন। উল্লেখ্য, বিহারের রাজনীতি বরাবরই অনিশ্চয়তায় ভরা। এক্সিট পোল যদি তেজস্বীর পক্ষেও হাওয়া দেখায় তাহলেও চূড়ান্ত ফলাফল জান-বোঝা যাবে ১৪ নভেম্বর শুক্রবার।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*