রমিত সরকার, কৃষ্ণনগর:
শ্রবণশক্তি নেই, কথা বলার ক্ষমতাও নেই। তবুও শিল্পসাধনায় ছেদ পড়েনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, নিষ্ঠা আর মাটির প্রতি গভীর ভালোবাসাকে সম্বল করেই আজও প্রতিমা গড়ে চলেছেন কৃষ্ণনগরের আনন্দময়ীতলার সত্তরোর্ধ্ব শিল্পী সত্য পাল। মাত্র সাত বছর বয়সে বাবার হাত ধরে মাটির কাজে হাতেখড়ি। তারপর কেটে গিয়েছে সাত দশকেরও বেশি সময়। জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে মাটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আজও অটুট।
ছোটবেলায় মাত্র ১৮ মাস বয়সে প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হন সত্যবাবু। চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে উঠলেও হারিয়ে যায় তাঁর শ্রবণশক্তি। সেই সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলার ক্ষমতাও। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর সৃজনশীলতাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। ইশারার মাধ্যমেই নিজের মনের ভাব প্রকাশ করেন তিনি।

সত্যবাবুর স্ত্রী গীতাদেবী জানান, বিয়ের পর শাশুড়ির মুখে স্বামীর ছোটবেলার অসুস্থতার কথা শুনেছিলেন তিনি। প্রচণ্ড জ্বরের আগে কিছু শব্দ শুনতে পেতেন সত্যবাবু। কিন্তু অসুস্থতার পর থেকেই শ্রবণশক্তি হারিয়ে যায় তাঁর।
সত্যবাবুর বাবা মাটির বিভিন্ন জিনিস তৈরি করতেন। মাত্র সাত বছর বয়সে বাবাকে কাজে সাহায্য করতে গিয়েই মাটির গলদা চিংড়ির চোখ ও পা তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি। সেই ছোট্ট কাজ থেকেই মাটির প্রতি জন্ম নেয় গভীর আগ্রহ। ধীরে ধীরে হাত পাকতে থাকে শিল্পে। যদিও শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রথম দিকে অনেকেই তাঁকে কাজে নিতে চাইতেন না। কিন্তু অন্যের সহযোগিতার অপেক্ষায় বসে না থেকে নিজের চেষ্টাতেই কাজ শিখে নেন সত্যবাবু। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়ে ওঠেন দক্ষ প্রতিমাশিল্পী।
দীর্ঘ পথচলায় তাঁর পাশে থেকেছেন সহধর্মিণী গীতাদেবী। প্রায় ৪০ বছর ধরে প্রতিমা তৈরির কাজে স্বামীকে সহযোগিতা করে চলেছেন তিনি। দু’জনের মিলিত প্রচেষ্টাতেই আজও এগিয়ে চলেছে সত্যবাবুর শিল্পসাধনা।
বয়সের ভারে এখন আর আগের মতো বড় প্রতিমা তৈরি করেন না সত্যবাবু। তুলনায় ছোট প্রতিমা তৈরিতেই বেশি মনোযোগ দেন। কিন্তু কাজের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা কিংবা উৎসাহে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। মাটির স্পর্শেই যেন খুঁজে পান জীবনের আনন্দ, নিজের অস্তিত্বের প্রকাশ।
কথায় নয়, তুলির টানে, মাটির স্পর্শে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন এই শিল্পী। তাঁর জীবন যেন বুঝিয়ে দেয়, শিল্পের কোনও ভাষা হয় না, প্রতিভার কোনও প্রতিবন্ধকতা থাকে না।

Be the first to comment