পাকিস্তানে কালীপুজো….সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনবদ্য নিদর্শন মরুতীর্থ হিংলাজ

Spread the love

পথের ক্লান্তি ভুলে/স্নেহ ভরা কোলে তব/ মাগো বলো কবে শীতল হবো? কতদূর আর কতদূর বলো মা….. মনে পড়ে ১৯৫৯ সালের সেই বিখ্যাত চলচ্চিত্রের কথা ? হ্যাঁ, বিকাশ রায় ও উত্তম কুমারের যুগলবন্দীতে কালজয়ী সেই সিনেমার থেকে নেওয়া এই গানটির গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ও গায়ক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।ছবির নাম মরুতীর্থ হিংলাজ।

পাকিস্তানের বালুচিস্তানের মরুভূমি অঞ্চলের অত্যন্ত দুর্গম স্থানে এই শক্তিপীঠ বা সতীপীঠ।মরুতীর্থ হিংলাজে সতীর মস্তিষ্ক তথা মন পড়েছিল বলে কথিত আছে।

পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন হঠাৎ মরুতীর্থ হিংলাজ নিয়ে কেন আমরা আলোচনা করছি? আসলে অবিভক্ত ভারত উপমহাদেশে সতীর যে ৫১ পীঠ পাওয়া যায় তার মধ্যে তিনটি বর্তমানের পাকিস্থানে।

পাকিস্তানের এই তিন সতী পিঠের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এই মরুতীর্থ হিংলাজ। দীপান্বিতা কালীপুজো উপলক্ষে আমরা মায়ের ৫১ পীঠ নিয়ে আলোচনা করছি। এই ৫১ পীঠের কাহিনী আমাদের সকলেরই অল্প বিস্তর জানা। দক্ষ রাজার অমতে কন্যা সতী মহাদেব কে বিবাহ করেন ।ক্ষুব্ধ প্রজাপতি দক্ষ রাজা যখন এক বিশাল যজ্ঞ করেন তখন তাদের শিবকে আমন্ত্রণ জানাননি। সতী শিবের এই অপমান সহ্য করতে না পেরে যজ্ঞে আত্মাহুতি দেন। এরপরেই রাগে ক্ষোভে যন্ত্রণায় শিব সতীর দেহ নিয়ে প্রলয় নৃত্য শুরু করেন। শিব তাণ্ডবে যখন ধ্বংস অনিবার্য তখন সকলে বিষ্ণুর তথা কৃষ্ণের শরণাপন্ন হন। তিনি সুদর্শন চক্র পাঠিয়ে সতীর দেহ টি অংশে বিভক্ত করে দেন। শরীরের সেই ৫১ টি অংশ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে পড়ে তৈরি হয়েছে সতীপীঠ বা শক্তিপীঠ।

মরুতীর্থে হিংলাজ মাতা পাকিস্তানের কট্টর ইসলামী মানসিকতা তথা উগ্র সাম্প্রদায়িক মনোভাব সত্ত্বেও সেখানকার সাধারণ মানুষের ভক্তিতে আজও পূজিতা হন।

পাহাড়ের গুহায় অবস্থিত এই হিংলাজ মাতা কে সারা বছর ধরে পূজার্চনা, রক্ষণাবেক্ষণ ভক্তি ভরে ভোগ নিবেদন করেন মূলত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরাই। তারা বড়ি নানি বলেন এখানকার মাতাকে। বিবি নানি কি দরগা বলেন এই মন্দিরকে। খুবই দুর্গম এই মন্দিরে পৌঁছানোর পথ। আসলে এই পথ আমাদের মানবজীবনকে এক কঠোর সত্য উপলব্ধি করতে শেখায়, তা হল কষ্টের মাধ্যমে , কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ভালো কিছু লাভ করা যায় ,ঈশ্বর প্রাপ্তি হয়। গুহায় দেবী মূর্তি পাথরেরই অংশ আলাদা কোলে মূর্তি নেই। আর তার বাইরে আছে একটি কুণ্ড। যেখানে কাদামাটি সব সময় ফুটছে। কথিত আছে পাপ করে এখানে স্বীকারোক্তি করলে পাপমুক্তি ঘটে। এ কোথাও প্রচলিত যে ভগবান রাম রাবনকে হত্যা করলেও রাবণ ছিলেন ব্রাহ্মণ ।তাই ব্রহ্মশাপ থেকে মুক্তি পেতে তিনি এই অত্যন্ত শক্তিশালী শক্তিপীঠ হিংলাজের পবিত্র কুন্ডের সামনে এসে প্রার্থনা করে পাপমুক্ত হন।

পাকিস্তানে অপর একটি শক্তিপীঠ হল শিবহরকরায় বা করবীপুর। এখানে দেবীর ত্রিনয়ন বা দিব্যচক্ষু পড়েছিল বলে বিশ্বাস। এটি করাচির পারকাই রেল স্টেশনের কাছে। দেবী এখানে মহিষাসুরমর্দিনী রূপে পুজো পান।

পাকিস্তানের অপর একটি শক্তিপীঠ হল পাক অধিকৃত কাশ্মীরের শারদা পীঠ। নিলম উপত্যকায় অবস্থিত এই শক্তি পিঠে দেবীর দক্ষিণ হস্ত বা ডানহাত পড়েছে বলে বিশ্বাস। যদিও এই মন্দির এখন ধ্বংসাবশেষে পরিণত।

এছাড়াও পাকিস্তানের বালুচিস্থানের কালাটের কালী মন্দির প্রায় দুই হাজার বছরের পুরনো। এখানে আজও কালীপুজো হয়। সতীপের না হলেও এই মন্দিরের মাহাত্ম্য দিকে দিকে ফিরে। হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই এই পুজোয় অংশগ্রহণ করে।

 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*