রমিত সরকার, কৃষ্ণনগর:
আজ ২৯ মার্চ, চৈত্র মাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে ঐতিহ্যবাহী কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির মাঠে শুরু হল ২৮০তম বারোদোল মেলা। দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি চললেও এবছর মেলার মূল আকর্ষণ—বিগ্রহ দর্শন থেকে বঞ্চিত থাকছেন সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি কৃষ্ণনগরের বর্তমান রাজা সৌমিশ চন্দ্র রায়ের প্রয়াণের জেরে শোকের আবহে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ পরিবার।
প্রতিবছরের মতো এবছরও প্রায় একমাসব্যাপী এই মেলার আয়োজন করা হলেও রাজবাড়ির দরজা দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী রাধাকৃষ্ণ ও গোপালের বিগ্রহ দর্শনের সুযোগ থাকছে না। রাজবাড়ির প্রতিনিধি অরিন্দম দে জানান, “রাজপরিবার বর্তমানে কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশে অংশ নেওয়া সম্ভব নয়। তবে শতাব্দীপ্রাচীন এই মেলা কখনও বন্ধ হয়নি, তাই মেলার আয়োজন বজায় রাখা হয়েছে।”
এদিকে, মেলায় বিগ্রহ দর্শন বন্ধ থাকায় কিছুটা হতাশ স্থানীয় বাসিন্দারা। কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা দীপালি বিশ্বাস বলেন, “বারোদোল মেলায় গেলে বিগ্রহ দর্শন এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এবার সেটা না থাকায় সেই টানটা যেন কমে গিয়েছে। তবে মেলা বন্ধ হয়ে গেলে বহু ছোট ব্যবসায়ীর সমস্যায় পড়তে হত, তাই মেলা হওয়াটা দরকার ছিল।”
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৭৪৬ সালে নদিয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের উদ্যোগে এই বারোদোল মেলার সূচনা। কথিত আছে, ছোটরানির ইচ্ছা পূরণ করতে না পারায় তাঁর অভিমান ভাঙাতে মহারাজা সভার পণ্ডিতদের সঙ্গে আলোচনা করে এই মেলার প্রচলন করেন। চৈত্র মাসের শুক্লা একাদশীতে বিষ্ণুমহলের ১১টি কক্ষে ১২টি রাধাকৃষ্ণ ও গোপালের বিগ্রহ দোলায় বসিয়ে তিনদিনব্যাপী পুজোর আয়োজন করা হত। রাজবেশ, ফুলবেশ ও রাখালবেশে দেবমূর্তিকে সাজানোর বিশেষ রীতি আজও এই মেলার ঐতিহ্যের অংশ।
ইতিহাসের এক কঠিন সময়ে—একদিকে বর্গী আক্রমণ, অন্যদিকে নবাবের রাজস্বের চাপ—সাধারণ মানুষের কাছে এই মেলা হয়ে উঠেছিল বিনোদন ও আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় ছিলেন শাক্ত উপাসক হলেও তিনি শাক্ত ও বৈষ্ণব ধর্মের মধ্যে এক অনন্য সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। নবদ্বীপের রাস উৎসব এবং কৃষ্ণনগরের বারোদোল মেলা সেই ঐতিহ্যেরই উজ্জ্বল নিদর্শন।
শোকের আবহে এবছরের বারোদোল মেলা কিছুটা ব্যতিক্রমী হলেও ঐতিহ্যের ধারা বজায় রাখতে মেলার আয়োজন ঘিরে কৃষ্ণনগরে আবারও ভিড় জমাতে শুরু করেছেন মানুষ।

Be the first to comment