তপন মল্লিক চৌধুরী :
একটানা সাড়ে ১৫ বছর দেশ শাসন, বাংলাদেশের আর কোনো রাষ্ট্র নেতা এত লম্বা সময় ক্ষমতায় থাকেননি। আর কোনো সরকারপ্রধান ফেরারি আসামিও হননি বা তার মাথার উপর ঝোলেনি মৃত্যুদণ্ডের খাঁড়া। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানদের মধ্যে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দুর্নীতি মামলায় জেলে যেতে হয়েছে। কিন্তু আদালতের রায়ে কাউকে ফাঁসির আসামি হতে হয়নি। হত্যার দায় মাথায় নিয়ে কাউকে বিদেশেও পালাতে হয়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের উত্তরাধিকার সূত্রেই হাসিনা সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসক দলের শীর্ষ পদে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এবং ক্ষমতার চূড়ায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের জনপ্রিয়তাকে সঙ্গী করে। যে শেখ হাসিনা একসময়ের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের নেত্রী ছিলেন, সেই তিনিই স্বৈরশাসক হিসাবে অভিহীত হন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে তাঁকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে হয়। হাসিনা সেই আন্দোলন দমাতে প্রায় ১৪০০ মানুষকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেই কারণে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত হতে হয়। এখন তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ফেরারি আসামি। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য যে আদালত শেখ হাসিনার সরকার গঠন করেছিল সেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চার মাসের বিচার প্রক্রিয়া শেষে সোমবার এই রায় ঘোষণা করেছে।
লম্বা রাজনৈতিক জীবনে শেখ হাসিনাকে মাত্র একবারই গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যেতে হয়েছিল। বাংলাদেশের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই চাঁদাবাজির এক মামলায় ধানমন্ডির ‘সুধা সদন’ থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে সরাসরি আদালতে, পরে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় বিশেষভাবে তৈরি সাবজেলে। এরপর প্রায় এগারো মাসের বন্দিজীবন কাটিয়ে তিনি ২০০৮ সালের ১১ জুন জামিনে মুক্তি পান এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। দু’মাস পরই দুর্নীতির মামলায় জেলে যান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তাঁকেও রাখা হয়েছিল সংসদ ভবন এলাকার আরেকটি সাবজেলে। পরে তিনিও জামিনে মুক্তি পান। এরপর তাঁরা দুজনেই ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেন, নির্বাচনে জেতে আওয়ামী লীগ আর এখান থেকেই শুরু হয় হাসিনার দেড় দশকের শাসনকাল। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ষাটের দশকে ইডেন কলেজে ছাত্রলীগের কর্মী হিসাবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় শেখ হাসিনা তাঁর মা, বোন ও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকায় বন্দি ছিলেন। রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব হত্যার সময় হাসিনা তাঁর স্বামীর সঙ্গে বেলজিয়ামে ছিলেন। ১৯৮১ সালে তাঁর অনুপস্থিতিতেই আওয়ামী লীগের সম্মেলনে তাঁকে দলীয় প্রধান নির্বাচিত করা হয়। সে বছরই অবশ্য তিনি দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নেন।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই দলীয় প্রভাবমুক্ত সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ১৯৯৬ সালে আওয়ামি লিগের জয় হয়। ২১ বছর পর লিগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে ক্ষমতায় ফেরে। কিন্তু ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোটের কাছে হেরে যায়। দ্বিতীয় মেয়াদে শেখ হাসিনা নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান ২০০৮ সালে। তবে তাঁর সাড়ে ১৫ বছরের শাসনে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে অগ্রগতি অর্জন করলেও গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে ছিল অসংখ্য অভিযোগ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ২০১১ সালে সংবিধান সংশোধন করে সেই ব্যবস্থাই আওয়ামি লিগ বাতিল করে দেয়। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ২০১৪, ১৮ এবং ২৪ সালে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন করা হয়। এর মধ্যে দশম ও দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি-সহ অধিকাংশ বিরোধী রাজনৈতিক দল। ফলে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টিতে আওয়ামি লিগ প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হন। সেই সংসদকে ‘বিনা ভোটের সংসদ’আখ্যা দেয় বিএনপি। ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়েও ওঠে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ। অধিকাংশ ভোট আগের রাতে হয়ে যাওয়ায় বিরোধীরা পায় মাত্র সাতটি আসন। সেই নির্বাচনও অভিহীত হয় ‘নিশিরাতের নির্বাচন’ বলে। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনও বিএনপি ও সমমনস্করা বয়কট করে কিন্তু আওয়ামি লিগ অংশগ্রহণমূলক দেখাতে শরিক ও বিরোধীদলের জন্য আসন ছেড়ে দেয় । নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের সঙ্গে দলের বিদ্রোহীদের। সেই নির্বাচনেরও নাম হয় ‘আমি আর ডামি’ নির্বাচন।
ফলে তিনটি নির্বাচনে আওয়ামি লিগ জয়ী হয়ে ১৫ বছরের বেশি বাংলাদেশ শাসন করেলেও নির্বাচনের অবাধ ও নিরপেক্ষতা নিয়ে, জনগণের আস্থা অর্জন নিয়ে তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কেউ ‘জনগণের ভোট ছাড়া নির্বাচন’, চার মেয়াদের শাসনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে ‘হার্ড পাওয়ার’, ‘ওয়ান উইমেন শো’ ইত্যাদি ভাষায় বর্ণনা করে । অভিযোগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দীর্ঘ শাসনে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের ৮ শতাংশে জিডিপি বৃদ্ধির দাবি করলেও তা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো। অভিযোগ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালীন পরিকাঠামোখাতে বিরাট উন্নয়ন আসলে দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং সরকার-ঘনিষ্ঠদের ব্যাংক খাতে লুটপাট।ক্ষমতার শেষ দিকে এক সংবাদ সম্মেলনে হাসিনা নিজেই বলেছিলেন, তার এক পিয়নই বনে গেছেন ৪০০ কোটি টাকার মালিক। কোটা সংস্কার আন্দোলনে নামা ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের ব্যাপক অত্যাচারে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশে। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে দেশ থেকে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা।
সাড়ে চার দশকে ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে তিনিই ছিলেন অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র, বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে হলে শেখ হাসিনার নাম আসবেই। কিন্তু শেখ হাসিনা বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তা করতেই উচ্চ আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দেন। তিনি প্রকাশ্যে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দাবি করতেন। এছাড়াও বিচারবহির্ভূত গুম-খুন, বিরোধী মত ও রাজনৈতিক দলের ওপর দমনপীড়নের বহু অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলের মতো পরিকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য হাসিনা প্রশংসা পেয়েছেন। যদিও এইসব প্রকল্প ও অন্যান্য খাতে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে। কেবল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়েই নয় তাঁর শাসনকালের পুরোটা সময় নিয়মিত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। বিরোধি নেতা-কর্মীদের উপর পরিকল্পিতভাবে হেফাজতে নির্যাতন, গায়েবি মামলাসহ নানা রকম নিপীড়ন হয়েছে যা মানবতাবিরোধী অপরাধ। এমনকি তিনি কোটা বিরোধী আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলেও সম্বোধন করেছেন। এরপরও প্রশ্ন বাংলাদেশ কী শেখ হাসিনাকে ফেরানোর জন্য ভারতকে চাপ দিতে পারবে? মৃত্যুদণ্ডবিরোধী অবস্থানের কারণে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে তা প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কী কারও অনুপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দেখা হয়। মূল বিচার এবং শুনানি অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে হওয়া নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।

Be the first to comment