তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি?; আজ বাইশে শ্রাবণ

Spread the love

“মৃত্যু সে ধরে মৃত্যুর রূপ, দুঃখ হয় হে দুঃখের কূপ

তোমা হতে যবে হইয়ে বিমুখ আপনার পানে চাই।”

 

আজ বাইশে শ্রাবণ, রবি ঠাকুরের চলে যাওয়ার দিন। ১৩৪৩ সালের প্রবাসী পত্রিকায় তিনি নিজে লিখছিলেন- “খ্যাতির কলরবমুখর প্রাঙ্গণে আমার জন্মদিনের যে আসন পাতা রয়েছে সেখানে স্থান নিতে আমার মন চায় না। আজ আমার প্রয়োজন স্তব্ধতায় শান্তিতে।”

মৃত্যু প্রসঙ্গে কবির সৃষ্টি –

“মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,

মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।

এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে

জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই।”

 

মৃত্যুর চৌকাঠ পেরিয়ে অনন্তের অভিলাষী হওয়া তাঁকেই সাজে। পঁচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণের মাঝে রচিত হয়েছে অনন্ত অমনিবাস। রবীন্দ্রনাথ  ঠাকুর মৃত্যুকে বলেছেন “জীবনের শেষ পরিপূর্ণতা”….

সূর্যালোক যেমন তাবৎ প্রাণের উৎস, রবীন্দ্রনাথের কাব্যালোক তেমনই বাঙালির জীবনবোধের আঁতুরঘর। প্রশ্বাসে ও প্রণয়ে, আনন্দে ও বেদনায়, উৎসবে ও ব্যসনে, দ্রোহ ও দহনে তিনিই তো বাঙালির ফ্রেন্ড ফিলজফার অ্যান্ড গাইড। আর তা হবে নাই বা কেন? তাঁর কাব্য, প্রবন্ধ, উপন্যাস, ছোট গল্প,  গান কিংবা কবিতায় অথবা সর্বত্র ছড়িয়ে আছে বেঁচে থাকার নির্যাস।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক জীবনে সাহিত্যের এমন বিচিত্র এক জগৎ রচনা করেছেন, যা বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্যের আসর করেছে মহিমান্বিত। বিপুল তার রচনা, বিচিত্র তার বিষয়। তিনি যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই ফলেছে রাশি রাশি সোনা। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, সংগীত, ভ্রমণ কাহিনি, চিঠিপত্র, সমালোচনা, চিত্রকলা সমৃদ্ধ হয়েছে তার অজস্র অনন্য সৃষ্টিতে।

১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তার নোবেলপ্রাপ্তি বাংলা সাহিত্যকে বিরল গৌরব এনে দেয়। শুধু সৃজনশীল সাহিত্য রচনায় নয়, সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা, অর্থনীতি নিয়ে স্বকীয় ভাবনাও তাকে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও গণশিক্ষার যে অগ্রযাত্রা আমরা এখন লক্ষ করি, রবীন্দ্রনাথ সেই সময় নওগাঁর পতিসর ও কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনে সে ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। গরিব কৃষক প্রজার কল্যাণে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কৃষি সমবায় ব্যাংক। পরে নোবেল পুরস্কারের টাকার একটি অংশও এই ব্যাংকে যোগ করেছিলেন। ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে গিয়ে দেশজ আদর্শ লালিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শান্তিনিকেতন।

জীবন স্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ মায়ের সম্পর্কে লিখেছেন, ‘যে রাত্রীতে তাঁহার মৃত্যু হয় আমরা তখন ঘুমাইতে ছিলাম। তখন কত রাত্রি জানি না, একজন পুরাতন দাসী আমাদের ঘরে ছুটিয়া আসিয়া চিৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, ‘ওরে তোদের কী সর্বনাশ হলরে।’ স্তিমিত প্রদীপে অস্পষ্ট আলোকে ক্ষণকালের জন্য জাগিয়া উঠিয়া হঠাৎ বুকটা দমিয়া গেল। কিন্তু কী হইয়াছে ভাল করিয়া বুঝিতে পারিলাম না। প্রভাতে বাহিরের বারান্দায় আসিয়া দেখিলাম তাহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপর শয়ান।’

এই অসীম, অনন্ত মহামানব, যিনি তাঁর দীর্ঘ ৮০ বছরের জীবন সাধনায়- জীবন আর মৃত্যুর এক ঈশ্বরিক মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন, তিনি হলেন; বিশ্বশ্রেষ্ঠ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ।

অন্তরের শ্রদ্ধাঞ্জলি রবি ঠাকুরের প্রতি।

 

লেখা- মাসানুর রহমান

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*