কলকাতা আন্তর্জাতিক সিনেমা উৎসব ও কিছু কথা

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী :

এদেশে প্রথম আন্তর্জাতিক সিনেমা উৎসব যখন শুরু হয়েছিল তখন তা দেশের রাজধানী মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরে অবশ্য সেই উৎসব দেশের অন্যান্য শহরেও হয়। আমাদের শহরে সিনেমার বিরাট উৎসব ১৯৮২ সালের ফিল্মোৎসব- সেই চলচ্চিত্র উৎসবে ছিল ফরাসি সিনেমার নবতরঙ্গের প্রাণপুরুষ জঁ লুক গোদারের একঝাঁক ছবি। আগের দিন মাঝরাত থেকে ছবির টিকিটের জন্য সোসাইটি সিনেমা হলের সামনে লাইন। কিন্তু গোদারজ্বরে আক্রান্ত কলকাতার সিনেমাপ্রেমীরা আবিষ্কার করলেন অন্য এক পরিচালককে- ইলমাজ গুনে। গোদার নিয়ে অনেক কথা হলেও তুরস্কের এই পরিচালকের ছবি দেখে মুগ্ধ হলেন কলকাতা সিনেমাপ্রেমীরা। হওয়ারই কথা, মার্কসীয় রাজনৈতিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ, ব্যক্তিগত জীবনে হত্যার দায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামি তিনিই আবার সার্থক সংগ্রামী চলচ্চিত্র-নির্মাতা। তিনি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একজন বিরল ব্যক্তিত্ব। তারপর ১৯৯০ এবং ১৯৯৪ সালের সিনেমা উৎসব। ’৯৪ সালে কলকাতায় জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসব হয়। সেই উৎসবে মাইকেলেঞ্জেলো আন্তনিওনির উপস্থিতিতে তাঁর বেশ কয়েকটি ছবি নিয়ে রেট্রোস্পেক্টিভ হয়েছিল। কলকাতা সিনেমা উৎসবেই সিনেমাপ্রেমীরা কুরোসাওয়া, রেনোয়া, মেসজারোস, পাসোলিনি, ব্রেসো, অ্যাঞ্জেলোপোলোস, আসগর ফরহাদি, আব্বাস কিয়ারোস্তামি, জাফর পানাহি, মোহাম্মদ রাসউলফ, সোলানাস, ওয়াল্টার সেলেস, গ্লাবার রোচা প্রমুখের ছবি দেখেন। উতসব প্রাঙ্গনে ঘুরে বেড়াতে দেখেছেন নুরি বিল সিলান, পল কক্স, মারিয়ান হ্যানসেন, আমোস গিতাই, আদুর গোপালকৃষ্ণন, গিরীশ কাসারভল্লি প্রমুখ। সেদিনের সিনেমা উৎসব যেন এক অদ্ভুত উত্তেজনা আর উদ্দিপনাময় হেমন্তসন্ধ্যা, এমনই বলে আজ মনে হয়। সেদিন আর আজ এক নয় একেবারেই, হওয়ারও কথা নয়। তবে একথা তো ঠিক যে, সিনেমা উৎসবেই আমরা ভীষণ ভাবে খুঁজি, আর খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও যাই। যেমন ভাবে পেয়েছিলাম ক্রিস্তভ কিয়েসলস্কি, পাওলো এবং ভিত্তোরিও তাভিয়ানি, থিওডোরোস অ্যাঞ্জেলোপোলোস, আন্দ্রেই তারকোভস্কি প্রমুখ।
১৯৯৫ সাল থেকে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হল। যদিও সেই উৎসবে দেশ বিদেশের ছবি দেখানো হত কিন্তু সেই উৎসবের নামে আন্তর্জাতিক কথাটি জোড়েনি। কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল নামে চলতে চলতে ২০১২ সালে উৎসবের তকমা জুটলো আন্তর্জাতিক। সেটি ছিল ১৯তম সিনেমা উৎসব। ফোকাস ছিল আফ্রিকা নাউ অ্যান্ড দেন, উদ্বোধনে দেখানো হয় ইরানের চিত্রপরিচালক অসগর ফারহাদির ছবি ‘নোদের অ্যান্ড সিমিন, এ সেপারেশন’। উল্লেখ্য, ২০১১ সালে এ রাজ্যের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটে। স্বভাবতই সিনেমা উৎসবের উপরও সেই ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নতুন করে সিনেমা উৎসবকে সাজানোর প্রচেষ্টায় গ্ল্যামার দেওয়া হয়। অনেক প্রশ্ন ওঠে। কেবল গ্ল্যামার তো বলা যায় না, রাজনীতেতে বদল মানে অনেক কিছুই উল্টে পাল্টে যায়। কিন্তু নতুন কী… সেই প্রশ্নটি কিন্তু তখন থেকে ছিল আজও আছে। কেউ ব অলেন, তেমন কী আর বদল হয়েছে, প্রতি বছর ওই একই, পুরোনো রুটিন সামান্য আগুপিছু করেই চলছে। কেউ বলছে সিনেমা উৎসব অনেকটা জায়গা নিয়ে নেয় সরকারের প্রচারে। আসল কথা, কলকাতা সিনেমা উৎসবের সূচনা হয়েছিল আন্তর্জাতিক ভালো সিনেমা যেন এই শহরের দর্শকদের কাছে পৌঁছয়। প্রথম দিকে এই উৎসব ছিল একেবারে সিনেমাকেন্দ্রিক, তারকাদের গ্ল্যামার সেভাবে ছিল না বলা যায়। দেশ বিদেশের সিনেমায় কি ঘটছে, কিভাবে ঘটছে, সবথেকে বড় কথা সিনেমার শিল্প ছিল মুখ্য বিষয়। সিনেমাপ্রেমীরা নতুন সিনেমা, নতুন ভাষা, নতুন নির্মাণ, শৈলী ইত্যাদির সঙ্গে পরিচিত হতেন। তাহলে কি আজ আর সেই সব হয় না? উৎসব থেকে তবে কী সিনেমার আলোচনা হারিয়ে গিয়েছে?
২০১১ থেকে যে সিনেমা উৎসবকে আরও বেশি ছড়িয়ে দেওয়া বা নন্দন কেন্দ্রিক না করে শহরের অন্যান্য প্রেক্ষাগৃহে দেখানো শুরু হল, আরও বেশি সাধারণ দর্শকদের কথা ভেবেই তো সেসব ব্যবস্থা, তা কি কোনো ভাবেই কার্যকরি হয়নি? না কি বিদেশ থেকে যেসব ছবি আনা হচ্ছে তার গুণমান আগের মতো নয়? তারকাদের উপস্থিতি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, কয়েকটি নির্বাচিত সিনেমা প্রদর্শন, তারপর পুরস্কার, হ্যাঁ এ পর্যন্ত একই নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা। কিন্তু ভারতীয় ছবির সংখ্যা দিন দিন বেড়েছে, হলিউডি ছবিও একাধিক… কিন্তু স্বল্প দৈর্ঘের ছবি বা প্রামান্য চিত্র, সেগুলি কী গুরুত্ব হারাচ্ছে? সিনেমা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কলাকুশলীরা কী সিনেমা উৎসবে গুরুত্ব পাচ্ছেন না, এ ধরনের বহু প্রশ্ন চারপাশে আলোচিত হচ্ছে, আগেও হয়েছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক মর্যাদা কিংবা সৃষ্টিশীল দিক থেকে উৎসবটা পিছিয়ে পড়ছে কি না সেটা যেমন দেখার বিষয় তেমনি দেখতে হবে এত বড় একটি উৎসব, এত এত টাকা পয়সা খরচ করে যে ঘটনা তা থেকে আমাদের সিনেমা শিল্পে আদৌ কোনো প্রভাব পড়লো কি না। সিনেমা তো সাধারণ মানুষের বিনোদনের উপাদান, উৎসবের অনেক ছবি তা পূরণ করে না, তা কেবল সিনেমা উৎসাহী বা সিনেমাপ্রেমীর মন ভরায়, একথা আমরা সবাই জানি।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*