একই দিনে দেশের ২ প্রান্তে প্রধানমন্ত্রী প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর শত্রুকে চ্যালেঞ্জ, কলকাতায় আসা খঞ্জর ও কোরা যেন সেই চ্যালেঞ্জেরই প্রতীক

Spread the love

পিয়ালি : 

আজ ২৮ নভেম্বর ২০২৫। কর্ণাটকের উদুপিতে শ্রীকৃষ্ণ মঠে লক্ষ কণ্ঠে গীতা পাঠ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার বক্তব্য যেমন উঠে আসে বসুধৈব কুটুম্বকম অর্থাৎ দ্য হোল ওয়ার্ল্ড ইজ আউয়ার ফ্যামিলি, তেমনি তিনি মনে করিয়ে দেন শত্রুরা দুঃসাহস দেখালে আমাদের সুদর্শন চক্র তাদের ধ্বংস করতে প্রস্তুত বলা ভালো তাদের ধ্বংস করে দেয়।

অন্যদিকে রাজধানী দিল্লিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেন দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের নিরাপত্তায় কোন আপোষ নয়। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী অত্যন্ত দক্ষ এবং সর্বদা প্রস্তুত। যে কোনো চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় আমরা তৈরি।

কাকতালিয়ভাবে কলকাতায় এসে পৌঁছেছে আইএনএস খঞ্জর ও আইএনএস কোরা নামে দুটি যুদ্ধ জাহাজ। এই দুটি যুদ্ধজাহাজ ইস্টার্ন নাভাল কমান্ডের ইস্টার্ন ফ্লিট-এর অন্তর্গত।

ইস্টার্ন ফ্লিট হল ভারতীয় নৌ বাহিনীর একটি নৌবহর। এটি ইস্টার্ন ন্যাভাল কমান্ডের বা পূর্ব নৌ কমান্ডের তলোয়ার বাহিনী নামে পরিচিত এবং সানরাইজ ফ্লিট নামেও এর পরিচয় আছে। তবে এই যুদ্ধ জাহাজ দুটি এসেছে আমজনতার সওয়ারি হওয়া ও পর্যবেক্ষণের জন্য।

খিদিরপুর ডকে তিন নম্বর গেট দিয়ে ঢুকলেই চোখে পড়বে, দুটি যুদ্ধ জাহাজ আইএনএস কোরা ও আই এন এস খঞ্জর পাশাপাশি রাখা আছে।

শুক্রবার ২৮ তারিখ সকালবেলায় প্রথমে সাংবাদিকদের জন্য সওয়ারীর সুযোগ। জাহাজে পা রাখতেই কানে এলো গুলজারের লেখা গানের কলি, এই বতন মেরে বতন আবাদ রাহে তু, মে যাহা রহু ইয়াদ রাহে তু। চোখের সামনে ভেসে ওঠে, মেঘনা গুলজার পরিচালিত ভারতীয় সেনাবাহিনীর বীরগাথা সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি চলচ্চিত্র রাজির দৃশ্য। শংকর এহসান লয়ের সংগীত পরিচালনায় অরিজিৎ সিং ও সুনিধি চৌহান-এর গাওয়া এই অনবদ্য গান দিয়ে প্রথমে খঞ্জরে প্রবেশ করলাম। তারপর কমোডর অজয় যাদব আরো আবেগতাড়িত করলেন তার প্রেস ব্রিফিং-এ। ৪ ডিসেম্বর নৌ-দিবসের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করলেন তিনি।

১৯৭১ সালে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে ভারতীয় নৌবাহিনী বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। ৪ ডিসেম্বর অপারেশন ট্রাইডেন্ট এর মাধ্যমে চারটি পাকিস্তানি ভেসেলের ওপর আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তানি নৌবাহিনীকে শুধু পরাস্ত নয়, রীতিমতো নাকানি চোবানি খাওয়ায় ভারতীয় নৌবাহিনী। একাত্তরের এই যুদ্ধের পরে নতুন দেশ বাংলাদেশ জন্ম নেয়। তাই চৌঠা ডিসেম্বরের এই গুরুত্বপূর্ণ দিনটিকে একাত্তরের যুদ্ধের পর ভারতীয় নৌবাহিনী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ইন্দো-পাক যুদ্ধে মৃত সৈনিকদেরও এই দিনটিতে স্মরণ করা হয়।

কমোডর অজয় যাদব (ন্যাভাল অফিসার ইনচার্জ ওয়েস্ট বেঙ্গল)  আরো একবার মনে করিয়ে দেন যে, খঞ্জর ও কোরা দুটি জাহাজই তৈরি হয়েছে গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স ও ইঞ্জিনিয়ারসে। অর্থাৎ দুটিই দেশীয় প্রযুক্তিতে ও দেশেই তৈরি। এটি আত্মনির্ভর ভারতের একটি নিদর্শন।

এরপরের পর্ব ছিল দুটি জাহাজ ঘুরে দেখা। কমান্ডার রনি চৌপু খঞ্জরের কমান্ডিং অফিসার। অপর জাহাজ কোরা পরিচালিত হয় কমান্ডার চন্দন ঝা দ্বারা। সাংবাদিকদের সঙ্গে অপকট রনি জানালেন এই দুই যুদ্ধ জাহাজের কথা।

আইএনএস খঞ্জর খুকরি শ্রেণির মিসাইল করভেট ।সমুদ্রপথে নিরাপত্তা রক্ষা, জলদস্যুতা রোধ, উদ্ধারকার্য, নৌ মহড়া, অবৈধ কার্যকলাপ প্রতিরোধ ইত্যাদি কাজে খঞ্জর অত্যন্ত দ্রুততা এবং তৎপরতার সঙ্গে কাজ করে। তার মোটো হল বেটার দ্যান দ্য বেস্ট। অন্যদিকে কোরা শত্রু জাহাজে আক্রমণে পটু। শক্তিশালী বিভিন্ন জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সমন্বিত যা সর্বোচ্চ পাল্লায় লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত করে। এর পাশাপাশি সারফেস কমব্যাট্যান্ট, বিমান প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ অনুসন্ধান উদ্ধারকার্য মহড়া ও টহলদারিতেও কোরা রীতিমত দক্ষ।

নৌ কমান্ডার রনি চৌপু উত্তর পূর্ব ভারতের অরুণাচল থেকে আসা প্রথম ব্যক্তি যিনি যুদ্ধ জাহাজ পরিচালনা করছেন। দৃপ্তকন্ঠে তিনি বললেন এখানেই আমাদের সফলতা আমরা ফিউচার লিডার তৈরি করতে চাই, তাই আমরা আমাদের এই দুই যুদ্ধ জাহাজ নিয়ে নৌ দিবস পালনে কলকাতায় এসেছি।

এই এন এস কোরায় যখন আমরা প্রবেশ করলাম তখন সেখানে তালে তালে বাড়ছিল হিম্মত হোস্লা হাসি হাতিয়ার/ কোরা হামেশা তৈয়ার। যার ইংরেজি করলে বলা যায় courage, confidence, enthusiasm weapons,/  kora always ready.

দুটি জাহাজই যুদ্ধাস্ত্র সমন্বিত। সেইগুলি দেখতে ভিড় জমান স্কুল পড়ুয়ারা। খিদিরপুর একাডেমী থেকে বালিগঞ্জের আর্মি পাবলিক স্কুল উত্তরের বিভিন্ন স্কুল থেকে দক্ষিনে যোধপুর পার্কের স্কুল পড়ুয়াদের আগ্রহ অসীম। বিশেষ করে এনসিসির ছাত্ররা ভবিষ্যতে আর্মি নেভি এয়ার ফোর্সে যোগদানের  কল্পনার উড়ান ভরতে শুরু করেছেন ইতিমধ্যেই। এই দুই যুদ্ধ জাহাজ এবং যুদ্ধাস্ত্র দেখে তারা রীতিমতো রোমাঞ্চিত। তাদের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও যারপরনাই উৎসাহিত।

ছাত্র শিক্ষক উভয়েরই বক্তব্য গতবারও এসেছিলাম যতবারই এ ধরনের যুদ্ধজাহাজ আসবে ততবারই আমরা চাক্ষুষ করতে চাই। ছাত্র-ছাত্রীদের বক্তব্য ভবিষ্যতে আমরাও এই পেশাকে অবলম্বন করে বড় হতে চাই।

জাহাজে উপস্থিত সিপিআরও, মিনিস্ট্রি অফ ডিফেন্স, ইস্টার্ন কমান্ড উইং কমান্ডার হিমাংশু তিওয়ারি বলেন ভারতীয় নৌশক্তির গৌরবকে নিজের চোখে দেখতে পাওয়া সৌভাগ্যের। এটি ছাত্রছাত্রীদের তথা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ভবিষ্যতে লিডার তৈরিতে পথ দেখায়। নৌ শক্তিকে, নৌ শক্তির সামুদ্রিক ঐতিহ্য অনুভব করা এবং সমুদ্র পাহারায় থাকা অতন্দ্র প্রহরীরা কি কঠিন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন সে সম্পর্কে ভাবী প্রজন্মের জানা প্রয়োজন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*