চায়ের ভাঁড়ের ধোঁয়া নেই, নেই ডালপুরির গন্ধ, কৃষ্ণনগর স্টেশনে উচ্ছেদের পর উন্নয়ন বনাম জীবিকার বিতর্ক

Spread the love

নিজস্ব সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর:

কয়েকদিন আগেও কৃষ্ণনগর রেল স্টেশনে পা রাখলেই কানে ভেসে আসত চায়ের ডাক, ভাজাভুজির গন্ধে ভরে থাকত প্ল্যাটফর্মের একাংশ। ট্রেন ধরতে এসে কেউ চা খেতেন, কেউ কিনতেন ডালপুরি, কেউ বা নিত্যপ্রয়োজনীয় ছোটখাটো জিনিস। সেই চেনা দৃশ্য এখন অতীত। রেলের উচ্ছেদ অভিযানের পর স্টেশনের বহু পুরনো দোকান ও হকার সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর সেই ঘটনাকেই কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

রেলের দাবি, স্টেশন আধুনিকীকরণ ও যাত্রী পরিষেবার মানোন্নয়নের জন্য এই পদক্ষেপ জরুরি ছিল। দীর্ঘদিন ধরে রেলের জমি দখল করে গড়ে ওঠা দোকানপাটের কারণে স্টেশনের সৌন্দর্য ও চলাচলের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছিল। ভবিষ্যতের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি হচ্ছিল বলে মনে করছে রেল কর্তৃপক্ষ।

তবে উচ্ছেদের পর শুধু দোকান নয়, বহু মানুষের জীবন-জীবিকাও যেন এক ধাক্কায় ভেঙে পড়েছে। বছরের পর বছর স্টেশন চত্বরে ব্যবসা করে সংসার চালানো অসংখ্য পরিবার এখন অনিশ্চয়তার মুখে। অনেকেরই অভিযোগ, পুনর্বাসনের কোনও স্পষ্ট ব্যবস্থা ছাড়াই উচ্ছেদ করা হয়েছে।

প্রতিদিন ট্রেনে যাতায়াত করা আরোহী বিশ্বাস বলেন, “স্টেশনের ওই দোকানগুলো শুধু ব্যবসার জায়গা ছিল না, যাত্রীদেরও ভরসার জায়গা ছিল। উন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু যাঁরা এতদিন এখানে ব্যবসা করেছেন তাঁদের ভবিষ্যতের কথাও ভাবা উচিত ছিল।”

অন্যদিকে প্রদীপ দাস নামে এক যাত্রী বলেন, “স্টেশনকে স্টেশনের মতো দেখতে হলে এই উচ্ছেদ দরকার ছিল। ভিড়ের মধ্যে হাঁটাচলা করাই কঠিন হয়ে যেত। এখন অন্তত খোলামেলা পরিবেশ তৈরি হয়েছে।”

ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমেও চলছে ব্যাপক আলোচনা। কোথাও উন্নয়নের পক্ষে সওয়াল, কোথাও আবার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান। ছবি, ভিডিও ও আবেগঘন পোস্টে ভরে উঠেছে ফেসবুকের টাইমলাইন। কমেন্ট বক্সে একপক্ষ বলছে, ‘আইন সবার জন্য সমান’, অন্যপক্ষের প্রশ্ন, ‘উন্নয়নের মূল্য কি শুধুই গরিবদের দিতে হবে?’

স্থানীয় মহলের মতে, বিষয়টি শুধুমাত্র অবৈধ দখলমুক্ত করার প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু মানুষের রুটি-রুজি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং প্রশাসনের মানবিক দায়িত্ববোধের প্রশ্নও।

কৃষ্ণনগর স্টেশনের চেহারা বদলাতে শুরু করেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া শত শত মানুষের উদ্বেগও সমানভাবে সামনে এসেছে। উন্নয়নের পথ কতটা মসৃণ হবে, আর সেই পথে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—সেই উত্তরই এখন খুঁজছে কৃষ্ণনগর।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*