পিয়ালি :
ইয়ে তো সিরফ ঝাঁকি হ্যায়, পিকচার অভি বাকি হ্যায়। কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরীর মুখে এই প্রচলিত প্রবাদ বাক্য দুটি শুনে শহিদ মিনারের মঞ্চও সংলগ্ন স্থানে উদ্দীপনায় মেতে ওঠেন উপস্থিত নেতাকর্মীরা। অধীর চৌধুরী আসার পর থেকেই প্রবল করতালিতে উপস্থিত নেতাকর্মীরা তাকে সম্মান জানান। অধীর বাবু বক্তৃতা করার সময় উৎসাহ উদ্দীপনা চরম আকার নেয়। আজ একুশে জুলাই, শহিদ তর্পণের দিন। রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদল বা পরিবর্তনের পর এই প্রথম একুশে জুলাই। এতদিন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বড় আকারে একুশে জুলাই করতেন কলকাতায়। কখনো তা ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে এবং বেশিরভাগই তা অনুষ্ঠিত হত ভিক্টোরিয়া হাউস অর্থাৎ ধর্মতলায় সিইএসসি অফিসের সামনে। লোকে লোকারণ্য হয়ে যেত, দেখা যেত শুধু কালো মাথার ভিড় ,সারা কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো হয়ে যেত স্তব্ধ ।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই শহিদ স্মরণ অনুষ্ঠান বর্তমান প্রজন্মের কাছে পরিচিত। এখনকার ছেলেমেয়েরা অনেকে জানেনই না ১৯৯৩ সালের ২১ শে জুলাই যুব কংগ্রেসের নেতৃত্বে নো এপিক কার্ড নো ভোট এই দাবিতে এই গণআন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল। একথা সত্যি যুব কংগ্রেসের এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৯৮ এর পয়লা জানুয়ারি তৃণমূল কংগ্রেস দল গঠন করার পর মমতা প্রতিবছরই ২১ জুলাই পালন করে থাকেন তবে কংগ্রেস ও ছোট আকারে হলেও মহাজাতি সদনে বা অন্যত্র একুশে জুলাই প্রতি বছরই পালন করতো।

২০২৬ এ বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগে মমতার একুশ স্মরণ এতটাই ব্যাপ্তি লাভ করেছিল যে কংগ্রেসের ছোট আকারের একুশে জুলাই পালন তার কাছে ঢাকা পড়ে যেত।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটের জেতা সংসদ বিধায়করা এখন ত্রিধা বিভক্ত হয়ে ২১ জুলাই পালন করছেন। কালীঘাট তৃণমূল অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস কোর্টের নির্দেশে ক্যাথিড্রাল রোড অর্থাৎ একাডেমী ও বিড়লা তারামণ্ডলের মাঝে রাস্তায় শহিদ তর্পণ করলেন। অন্যদিকে ঋতব্রত তৃণমূল অর্থাৎ নব তৃণমূল গান্ধী মূর্তির পাদদেশে শহিদ স্মরণ করলেন। আর এনসিপিআই এর ছাতার তলায় যেসব তৃণমূল সাংসদরা দিল্লিতে রাজঘাট অর্থাৎ গান্ধী সমাধিতে স্মৃতি তর্পণ করলেন তাদের কথাও বলা প্রয়োজন।

তৃণমূল কংগ্রেসের এই ঘরোয়া তরজায় এই টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ায় কংগ্রেস যে আক্ষরিক অর্থে অক্সিজেন পেয়েছে সে কথা বলাই বাহুল্য। আজ পালাবদলের পর শহিদ মিনারে কংগ্রেসের শহীদ দিবস পালন অনুষ্ঠান তাই ছিল কালো মাথার ভিড়ে পূর্ণ।
বর্ষাকাল । শহিদ মিনার সংলগ্ন মাঠে ছিল যথেষ্ট জল কাদা। এইসব উপেক্ষা করেও মানুষ এসেছেন কাতারে কাতারে। আর তাই দেখে উজ্জীবিত নেতা কর্মীরা।

সভায় অধীর চৌধুরী বলেন, কলকাতার বুকে দুটি সার্কাস চলছে। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের দুটি সভার প্রসঙ্গে এ কথা বলেন। অধীর এও বলেন, আমি শুধু বাংলায় নয় সারা ভারতে পরিবর্তনের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। রাজ্যে শুধু পরিবর্তন নয়, কংগ্রেসের প্রত্যাবর্তন হবে। সামনে অনেক বড় লড়াই সংগ্রাম। অনেক দেখা হলো, আর মোদি নয়, আমরা চাই রাহুল গান্ধীকে এবং রাজ্য এবং কেন্দ্রে কংগ্রেসকে আনতে গেলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন ঐক্য বা একতা।
প্রতিকূল আবহাওয়াতে এদিনের সভা ঘিরে যেমন কর্মী সমর্থকদের উচ্ছাস উন্মাদনা লক্ষ্য করা যায় তেমনি মঞ্চ ছিল তারকা খচিত। দিল্লি থেকে এসেছিলেন দেবপ্রসাদ রায় ওরফে মিঠুদা, দীপা দাশমুন্সি, প্রকাশ যোশি, উদয় ভানুর ছিব, আম্বা প্রসাদ ইমরান প্রতাপগাড়ি। এছাড়া ছিলেন প্রদীপ ভট্টাচার্য, ঈশা খান, মৌসম নুর প্রমুখ। ইমরানের বক্তব্যে ও মঞ্চে তুমুল হাততালি ও উন্মাদনা লক্ষ্য করা যায়। তিনি বলেন প্রায় ৫০ বছর কংগ্রেস বাংলায় ক্ষমতায় নেই, তা সত্ত্বেও যে শহিদ মিনার ভরিয়ে দিয়েছেন যে সব নেতা কর্মীরা তাদের তিনি স্যালুট জানান। ইমরান আরো বলেন বাংলা মুশকিল সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, বিধানসভায় কংগ্রেসের পতাকা উঠলে তবেই ৯৩ এর একুশে জুলাই এর ১৩ জন শহিদকে শ্রদ্ধা জানানো হবে। তিনি বলেন বাংলার সাথী কর্মীরা কংগ্রেসের ঝান্ডা তুলুন কংগ্রেসের ঝাণ্ডার তলায় আসুন ওটাই আপনাদের পুরনো ঝান্ডা। শহিদ পরিবার থেকেও উপস্থিত ছিলেন প্রয়াত কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাদা বিকাশ ব্যানার্জি। প্রয়াত শহিদ মুরারী চক্রবর্তীর ভাই কৃষ্ণ চক্রবর্তী একটি চিঠি লিখেও পাঠান।

এদিনের সভায় প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন। তিনি বলেন জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে কংগ্রেস ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বিশাল জনসভা করবে, আর সেখানে উপস্থিত থাকবেন রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী।
২১শে জুলাই কমিশনের রিপোর্ট বিধানসভায় পেশ করার প্রক্রিয়াকে নিয়ে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বলেন, “বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীও তৃণমূল সরকারের রিপোর্ট চেপে দেওয়ার সিদ্ধান্তের শরিক, কারণ সেই সময় উনি ওই সরকারের ক্যাবিনেট মন্ত্রী ছিলেন।”

অন্যদিকে, ২১শের কর্মসূচির দায়িত্বে থাকা প্রাক্তন যুব কংগ্রেস সভাপতি অমিতাভ চক্রবর্তী বলেন, “ আজ মনীশ গুপ্তর প্রতিকৃতি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রেখে, হাজার হাজার কংগ্রেস কর্মীদের সামনে তাঁর গণ বিচার হয়েছে। শহিদ মিনার ময়দানে, এই বিচারে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, কংগ্রেস তাঁর নামে এফআইআর করবে এবং আমরা পুলিশ মন্ত্রীর কাছে আর্জি জানাব, যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত শেষ করে মনীশ গুপ্তেকে বিচারের আওতায় আনা হোক।

সমগ্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করে শুভঙ্কর সরকারের নেতৃত্বে প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব। তারা বারবার অভিযোগ জানান যে বিজেপির তরফে তাদের কর্মীদের বিভিন্ন জেলা থেকে আসতে বাধা দেওয়া হয়েছে, কেউ কেউ আহত হয়েছেন।
এ দিলে কংগ্রেসের সভায় সংখ্যালঘু শ্রেণী ও মহিলাদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।

Be the first to comment