মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রাঙ্গন নন্দন-এ আগাম খবর ছাড়াই সিনেমাপ্রেমীদের মাঝে হাজির হন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। এসে নিজেই বলেন, নন্দনে এসেছেন কাউকে না জানিয়েই। উৎসব কমিটির চেয়ারম্যান গৌতম ঘোষ, মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন, অরূপ বিশ্বাস, সাংসদ জুন মালিয়া এবং চলচ্চিত্র উৎসবের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দেন। তবে সিনেমা দেখার সময় হয়নি।

এবার উৎসবে নেই কোনো বাংলাদেশের ছবি। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার বাংলাদেশের কোনো ছবি নেই এই বাংলার মর্যাদাপূর্ণ এই ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। গতবার অর্থাৎ ৩০তম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবেও ছিল না। এবারের উৎসবে ভারত-সহ ৩৯টি দেশের মোট ২১৫টি ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে৷ এর মধ্যে রয়েছে ১৮টি ভারতীয় ভাষার ছবি। কিন্তু জায়গা পায়নি বাংলাদেশের কোনো ছবি। কিন্তু কেন? চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানা গিয়েছে, আন্তর্জাতিক বিভাগে বাংলাদেশ থেকে জমা পড়েছিল কেবল তানভীর চৌধুরী পরিচালিত ‘কাফ্ফারাহ’, অর্থাৎ একটি ছবি। কিন্তু ছবিটি চলচ্চিত্র উৎসব কমিটির প্রত্যাশা পূর করতে পারেনি ফলে সেটি উৎসবে জায়গা পায়নি৷ অথচ বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি ছবি বিগত উৎসবে এই বাংলার সিনেমা প্রেমীদের মন কেড়েছিল। প্রসঙ্গত, মোহাম্মদ কাইয়ুম পরিচালিত ‘কুড়া পক্ষীর শূণ্যে উড়া’ ছবিটি ২০২২ সালে ২৮তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যৌথভাবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সেরা চলচ্চিত্রের জন্য গোল্ডেন রয়েল বেঙ্গল টাইগার পুরস্কার জিতেছিল৷ রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত পরিচালিত ‘নোনাজলের কাব্য’ ২৬তম চলচ্চিত্র উৎসবে এশিয়ান সিলেক্ট পুরস্কার পেয়েছিল। এছাড়াও বাংলাদেশের কয়েকটি ছবি দ্য এশিয়ান সিলেক্ট-এ নমিনেশন পেয়েছিল। এদের মধ্যে ‘জে কে ১৯৭১’ -ফখরুল আরেফিন খান পরিচালিত ছবিটি ২৮তম কিফ-এর জন্য মনোনয়ন পায়। ২০২৩ সালে ২৯তম KIFF-এর জন্য মনোনয়ন পায় সৈয়দা নিগার বানু পরিচালিত ‘নোনা পানি’, ২৭তম KIFF-এ মনোনয়ন পেয়েছিল শবনম ফেরদৌসী পরিচালিত ‘আজব কারখানা’, ২৫তম কিফ-এ এশিয়ান সিলেক্ট বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছিল এন রাশেদ চৌধুরী পরিচালিত ‘চন্দ্রাবতী কথা’, এছাড়াও বলতে হয় মেজবাউর রহমান সুমনের ছবি ‘হাওয়া’র কথা, কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানোর পর হইচই পড়েছিল, জনপ্রয়তা পান বাংলাদেশের অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। এইসব কারণে শহরের বহু সিনেমা প্রেমীদের প্রশ্ন, কেন নেই বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার নন্দন এক-এ যে ছবিগুলি দেখানো হল তার মধ্যে প্রথবে বলতে হয় দুপুর ২-টোয় গুয়েতেমালার ছবি ‘মাউন্টেনস অফ ফায়ার’, পরিচালনা হায়রো বুস্তামান্তের, এটি তাঁর নতুন ছবি। হায়রো বুস্তামান্তে গুয়াতেমালায় স্বাধীনভাবে নির্মিত ছবির জগতে প্রথম সারির নাম। তাঁর ছবির কেন্দ্রে থাকে মূলত গুয়াতেমালার মায়া জনজাতির মানুষজন, তাদের জীবনযুদ্ধ, দেশের ইতিহাস ও কঠোর রাজনীতি। এই ছবিটি শীঘ্রই বিস্ফোরণ ঘটতে চলা এক আগ্নেয়গিরি, নিকটবর্তী অঞ্চলে বসবাস করা আদিবাসী সম্প্রদায়, দুই শহুরে আগ্নেয়গিরিবিদ, তাদের আশঙ্কা এবং সরকারি দুর্নীতি ও অবহেলার গোপন খতিয়ান নিয়ে।ছবিতে ধরা হয়েছে আদিবাসী অধিকার, পদ্ধতিগত নিপীড়ন এবং LGBTQ+ অধিকারের মতো বিষয়গুলি। বুস্তামান্ত ২০১৯ সালে গুয়াতেমালায় শেষবারের মতো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কথা স্মরণ করেন যেখানে তিনটি আদিবাসী সম্প্রদায় লাভার নীচে চাপা পড়েছিল। তিনি উল্লেখ করেন, “এটিকে একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছিল কিন্তু মানুষের মৃত্যু একটি সামাজিক বিপর্যয়”। তিনি আরও বলেন, “এইসব মানুষদের বাস্তুচ্যুত করা হয়েছিল এবং ওই বিপজ্জনক এলাকায় বসবাসের জন্য পাঠানো হয়েছিল তাই আমরা জাতিগত, বর্ণগত এবং সামাজিক বৈষম্যের একটি ঘটনার কথা বলছি”।
বিকেল সাড়্ব ৪-টের সময় নন্দন এক-এ দেখানো হয় টনি গ্যাটলিফের নতুন ছবি ‘অ্যাঞ্জ। ছবিটি দেখার ইচ্ছা ছিল অনেক আগে থেকেই কারণ, রোমানি তথা জিপসি সংস্কৃতি, তাদের আত্মপরিচয়, সংগীত, যাযাবরী জীবনযাপন ও সান্ধভাষা নিয়ে টনি গ্যাটলিফ আজীবন কাজ করে গিয়েছেন এবং একদা যিনি বানিয়েছিলেন ‘লাচো ড্রম’ (১৯৯৩), ‘গাজো ডিলো’(১৯৯৭), ‘এক্সিলস’(২০০৪), ‘জ্যাম’(২০১৭)-এর মতো ছবি। নতুন এই ছবিটিতে আমরা দেখি ৬০ বছর বয়সে, অ্যাঞ্জ তার পুরনো বন্ধু মার্কোর সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন অনুভব করেন। তাঁর অতীত প্রেমের কন্যা সোলিয়া, যে পৃথিবীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী, এই যাত্রায় তাঁর সঙ্গে যোগ দেয়। একসঙ্গে তাঁরা আনন্দের পথ পুনরায় আবিষ্কার করে। তাঁদের যাত্রাপথের নানা প্রান্তরে আমরা পরিচিত হতে থাকি দক্ষিণ ফ্রান্সের যাযাবর সংস্কৃতির নানা সুর ও তালের সঙ্গে।

Be the first to comment