রমিত সরকার, কৃষ্ণনগর : কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ির দুর্গাপুজো মানে শুধু ধর্মীয় আচার নয়—এ এক ইতিহাস, এক উত্তরাধিকার, যা কয়েক শতক ধরে সমান ভক্তিভরে পালিত হচ্ছে। এই পুজোর প্রাণকেন্দ্রে রয়েছেন ‘রাজরাজেশ্বরী’—রণরূপিণী দুর্গা, যাঁর আরাধনায় প্রতিবছর মেতে ওঠেন কৃষ্ণনগরের মানুষ।
রাজবাড়ির দুর্গামূর্তি আলাদা বৈশিষ্ট্যে অনন্য। দেবীর সামনের দুটি হাত বড়, পিছনের আটটি তুলনায় ছোট। গায়ে বর্ম, মুখে যোদ্ধার দৃপ্ত অভিব্যক্তি। পেছনে বাংলা চালিতে আঁকা থাকে একদিকে দশাবতার, অন্যদিকে দশমহাবিদ্যা, আর মাঝখানে বিরাজ করেন পঞ্চানন শিব। পৌরাণিক সিংহই এখানে দেবীর বাহন। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যেই রাজরাজেশ্বরী আলাদা পরিচয় পেয়েছেন।
উল্টোরথের পরদিন কাঠামো পুজো দিয়ে প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হয়। একসময় প্রতিমাকে সাজানো হতো আসল সোনার গয়নায়। বর্তমানে সোনার ব্যবহার না থাকলেও প্রতিমার সাজসজ্জা আজও প্রচলিত ডাকের সাজের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। একসময় রাজবাড়িতে অন্নপূর্ণা পূজোও হত সমান আড়ম্বরে।
দশমীর অন্যতম আকর্ষণ ছিল নীলকণ্ঠ পাখি উড়ানো। বিশ্বাস ছিল, দেবীর বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে পাখিটি নিয়ে যাবে সমস্ত অশুভ শক্তি। যদিও এই প্রথা আর নেই, তবুও তার স্মৃতি কৃষ্ণনগরের মানুষের মনে জাগ্রত। অন্যদিকে, সন্ধিপুজো আজও এই পুজোর প্রধান আকর্ষণ। কামান দেগে পশুবলির রীতি বহু আগেই উঠে গিয়েছে, এখন তার জায়গায় বলি হয় আখ ও চালকুমড়ো। প্রথা মেনে এখনও সন্ধিপুজোয় ব্যবহার হয় ১০৮টি পদ্মফুল ও ১০৮টি প্রদীপ।
রাজবাড়ির ভোগের রীতিও সমান অনন্য। মহালয়া থেকেই শুরু হয় পূজার ভোগ রান্না।
সপ্তমীতে পরিবেশন করা হয় সাত রকম ভাজা।
অষ্টমীতে থাকে পোলাও, ছানার ডালনা, আট রকম ভাজা ও নানা মিষ্টি।
নবমীতে নয় রকম ভাজা ও তিন প্রকার মাছের আয়োজন।
দশমীতে ভোগে থাকে গলা ভাত, সিঙি মাছ, খই, দই, চিড়ে ও ফল।
এই ভোগের ঐতিহ্যও কৃষ্ণনগরের মানুষের কাছে সমান টান জাগায়।
২০০২ সালে বর্তমান রানি অমৃতা রায় চালু করেন সবার জন্য দশমীর সিঁদুর খেলা। আজ তা রাজবাড়ির পুজোর অন্যতম জনপ্রিয় আয়োজন। রাজপরিবার থেকে সাধারণ মানুষ—সবাই একসঙ্গে মেতে ওঠেন এই আনন্দে।
সবশেষে, সেই চিরন্তন প্রথা—সঙে চাপিয়েই রাজরাজেশ্বরীর প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয় দিঘিতে। শুধু একটি বিসর্জন নয়, কৃষ্ণনগরের মানুষের কাছে এটি এক আবেগ, এক আত্মিক সংযোগ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে ঐতিহ্য টিকে আছে, সেটাই আজ রাজবাড়ির পুজোর আসল শক্তি।
কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পুজো তাই কেবল উৎসব নয়, ইতিহাস ও আবেগে গড়া এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।

Be the first to comment