পিয়ালী :
সেটা ২০০৭-এর শেষের দিক। দিল্লিতে তখন প্রচন্ড ঠান্ডা। আমি তখন দিল্লিতে সবে ট্রান্সফার হয়েছি। পলিটিকাল বিট করার খাতিরে সেদিন গিয়েছিলাম বিজেপি অফিস। তখন বৈদ্যুতির মাধ্যমে। যতদূর মনে পড়ে সেদিন সুষমা স্বরাজের প্রেস কনফারেন্স ছিল। সাংবাদিক সম্মেলন হয়ে যাওয়ার পর আমরা অশোকা রোডে তৎকালীন বিজেপি অফিসে ছোট্ট ক্যান্টিনটিতে খাওয়াদাওয়া করতাম। সেদিন হঠাৎ ক্যান্টিন যাওয়ার পথে মুখোমুখি হই মুক্তার আব্বাস নকভির। বিজেপির সিনিয়র লিডার। পরিচয় হতেই বললেন আরে তোমরা করছো কি? আমাদের সঙ্গে না হয় কংগ্রেসের আদর্শগত মতভেদ আছে (আইডিওলজিকাল ডিফারেন্স), কিন্তু তোমাদের রাজ্যে প্রিয়দা, মমতা সবাই মিলে তোমরা এই বামফ্রন্টের এতদিনের শাসনকে হঠাতে পারছ না? আমরাও তো মনে মনে চাই এই কমিউনিস্ট শাসনের অবসান হোক। এ তো গেল নকভির কথা। এর আগে কলকাতায় সাংবাদিকতা করার সময় একবার প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সীর একটি বক্তব্য খুব মনে পড়ে। এক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, তাঁকে প্রমোদ মহাজন বলেছিলেন আমরা তোমরা হয়তো এক হতে পারি না, কিন্তু যাই বলো যেভাবেই হোক পশ্চিমবঙ্গ থেকে এই কমিউনিস্টদের সরানো দরকার।
হ্যাঁ, তখন থেকেই ২০১১ ভোটের সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৯৮ সালের পয়লা জানুয়ারি তৃণমূল কংগ্রেস দল তৈরি করেন। প্রবল সিপিএম বিরোধিতা এবং সিপিএমের সঙ্গে কোন রকম আপোষ না করার মতাদর্শের ভিত্তিতে তৈরি হয় এই দল। দল তৈরির পরই ২০০০ সালে ছোট লাল বাড়ি অর্থাৎ কলকাতা পুরসভা দখল করে তৃণমূল কংগ্রেস। তখন বিজেপির সঙ্গে জোট করে চলছিলেন মমতা। পরে তাহেলকা কাণ্ডে বাঙ্গারু লক্ষণের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ কে সামনে খাড়া করে বিজেপি ছাড়েন মমতা।
২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে, রবিনসন স্ট্রিট-এ কংগ্রেস নেতা কমলনাথের বাড়িতে হয়েছিল ম্যারাথন বৈঠক। প্রায় আটচল্লিশ ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে আমরা সেই মিটিং কভার করি। তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর সঙ্গে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের বৈঠক হয় এবং অবশেষে কমলনাথের দৌত্যে কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস বিধানসভা ভোটের আগে জোট করে।
২০০১ বিধানসভা নির্বাচনে সারা রাজ্য জুড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঝড়ো প্রচার করেন। তাঁর কনভয়-এর পেছনে তখন মালার মত সাংবাদিকদের গাড়ি থাকতো, বলা ভালো ছুটত।
রাজ্যে তখন দোর্দণ্ডপ্রতাপ বাম-শাসন। আর আমি একটি স্যাটেলাইট ইলেকট্রনিক মিডিয়ার হয়ে শাসকবিরোধী অর্থাৎ কংগ্রেস তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি বিটের খবর করতাম। বিরোধীতে থাকলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন বিভিন্ন খবরের কাগজ ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পুরোভাগে। প্রায় রোজদিনই তিনি প্রথম পাতা দখল করে থাকেন। স্বাভাবিকভাবেই আমার অফিস অ্যাসাইনমেন্ট দেয় যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জেলায় জেলায় প্রচারে তার সঙ্গে আমাকে ঘুরতে হবে। ব্যাপারটা খুব সহজ ছিল না। তিনি তখন যেন বাষ্পের গতিতে স্টিমারের মত চলছেন। কলকাতার কালীঘাটের বাড়ি থেকে রওনা হয়ে আজ বীরভূম তো কাল নদীয়া তো পরশু মুর্শিদাবাদ তো তারপরের দিন মালদা। তবে আমাদের একটাই সুবিধা ছিল তখন তিনি হেলিকপ্টারে যেতেন না। তাই গাড়ি নিয়ে তাকে ফলো করা অনেক সুবিধা ছিল। নাওয়া-খাওয়া ভুলে সেই কাজটাই তখন করতাম। তার মিটিংয়ে দেওয়া বক্তব্যের দুটি বিষয় খুব মনে পড়ে। মমতা স্লোগান দিয়েছিলেন ‘হয় এবার নয় নেভার’। অর্থাৎ সিপিএমকে হঠাতে গেলে এবারেই করতে হবে, না হলে কোনদিনই করা যাবে না। আরেকটি জিনিস খুব মনে পড়ে। তার সভায় প্রায়শই বৃষ্টি হতো। মমতা বলতেন এটা বাংলা মায়ের চোখের জল আমরা এই জল মুছিয়ে দেব।
কিন্তু না, ২০০১ এ মমতা তাঁর লক্ষ্যপূরণ করতে পারেননি। সিপিএমকে হঠানোর দৃঢ়প্রতিজ্ঞা নিয়ে তিনি যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন তা বাস্তবতার দিকে মোড় নেয়নি।
অনেকে প্রশ্ন তুলছেন কেন ১৫ বছর শাসন চালানোর পরেও মমতাকে সরে যেতে হল?
১৫ বছরে তিনি জনপ্রিয় ছিলেন কিনা তা ইতিহাসে লেখা থাকবে, তার উত্তর জনগণ দিয়েছেন। তবে এই দেড় দশকে জনকল্যাণমুখী যে কিছু প্রকল্প তিনি নিয়েছেন তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। এই বিষয়বস্তুতে আসার আগে গৌরচন্দ্রিকা এইজন্যই করলাম যে একটা সময়, সিপিএমকে হঠাতে বিজেপি ও চাইত মমতা কংগ্রেস সবাই মিলে কমিউনিস্ট শাসনের অবসান হোক।
মমতা ২০০১ এ পারেননি ২০০৬ তে কংগ্রেস এবং মমতা আলাদা লড়াই করেন। সেবারেও মমতা তার লক্ষ্য পূরণ করতে পারেননি। সেই সময় রাজ্যে সিঙ্গুর আন্দোলন এবং মমতা ব্যানার্জির মেট্রো চ্যানেলে অনশন। তারপর নন্দীগ্রাম আন্দোলন এবং তারও পরবর্তীতে সিঙ্গুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনশন রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন প্রেক্ষাপটের অবতারণা করে। চমকাইতলা, নেতাই নানুর ইত্যাদি বহু আন্দোলন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করেছেন কিন্তু তার ভাষায় বামফ্রন্টের জগদ্দল পাথরকে সরানোর ক্ষেত্রে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।
এরপরে আসে ২০০৮ এর পঞ্চায়েত নির্বাচন ও ২০০৯ এর লোকসভা নির্বাচন। তখন থেকেই প্রায় পরিষ্কার হয়ে যায় যে বামফ্রন্ট বিদায় নিতে চলেছে। ২০১১-এ প্রবল ম্যান্ডেট নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার গঠন করেন। অবশ্যই তখনো তার সঙ্গে জোট সঙ্গী ছিল কংগ্রেস। যদিও সরকার গঠনের পরে এই জোট ভেঙ্গে যায়।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো বেশ কিছু উন্নয়নমুখী প্রকল্প করেছেন। কিন্তু জমি আন্দোলন করে ক্ষমতায় আসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার জমি নীতি পরিবর্তন করতে পারেননি। তার এবং তার পূর্বতান বামফ্রন্ট সরকারের আমলকে শিল্প বিরোধী তকমা লাগিয়ে দেয় বড় বড় উদ্যোগপতিরা। তাই প্রত্যেক বছর ঘটা করে বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট করলেও এবং তারপরে অমিত মিত্রের প্রেস কনফারেন্সে প্রচুর বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা হয়নি।
রাজ্যে ভারী শিল্প না আসাটা আমার মনে হয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের একটা অন্যতম ব্যর্থতা। টাটা চলে যাওয়াটা তাৎক্ষণিকভাবে তৃণমূলকে ডিভিডেন্ট দিলেও পরবর্তীতে মানুষ বুঝেছিলেন যে ওইরকম একটা শিল্প সম্ভাবনা থেকে মমতা ব্যানার্জির জন্যই তারা বঞ্চিত হলেন।
বিশেষ করে নতুন ভোটার এবং যুবক-যুবতীরা, যাদের পরিবার-পরিজন ছেড়ে উচ্চশিক্ষা বা চাকরির জন্য চলে যেতে হয় ভিন্ন রাজ্য বা বিদেশে তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর তথাকথিত শিল্প বিরোধী ভূমিকাকে ভালো চোখে দেখেননি। অন্যদিকে এই ছেলেমেয়েদের মা-বাবারাও অর্থাৎ যারা প্রৌঢ় বা বৃদ্ধ, বৃদ্ধা তারাও একাকী হয়ে গেছেন। কারণ তাদের ছেলেমেয়েরা ভিন রাজ্যে কাজ করতে বা পড়াশোনা করতে চলে গেছে। তাই প্রখ্যাত টেনিস প্লেয়ার এবং বিজেপি নেতা লিয়েন্ডার পেজের সঙ্গে গলা মিলিয়ে সকলেরই বক্তব্য হলো কলকাতা যেন পরিণত হয়েছিল একটা ওল্ড এজ হোম বা বৃদ্ধাশ্রমে।
রাজ্যে চাকরির অভাব, শিল্প নেই এইসব অপ্রাপ্তির মধ্যে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত দেখা দিল প্রচন্ড দুর্নীতি। রাজ্যের মন্ত্রীর সঙ্গিনীর বাড়ি থেকে মিলল ৫০ কোটি টাকা ও প্রচুর গয়না। প্রায় হাফ ডজন মন্ত্রীর জেল যাত্রা হল শিক্ষা দুর্নীতি ও অন্যান্য দুর্নীতির কারণে এই সীমাহীন দুর্নীতি বাঙালি কালচারের সঙ্গে একেবারেই মেলে না।
চালের সঙ্গে কাঁকর অর্থাৎ যোগ্যের সঙ্গে অযোগ্যদের মিশিয়ে দিয়ে শিক্ষা দুর্নীতি করার ফলে হাজার হাজার যোগ্য শিক্ষকেরা কাজ হারায় তাদের পরিবারগুলো সীমাহীন দুরবস্থার মধ্যে পড়ে। অন্যদিকে অর্থ নিয়ে চাকরি দেওয়ার ফলে, এবং এই সংক্রান্ত নানাবিধ দুর্নীতির ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়। একটা সময় বলা হত সততার প্রতীক মমতা এবং মমতার প্রতীক জোড়া ফুল ।এই স্লোগান দিতেন তার অনুগামীরা। মানুষ ও তার সরল সাধারণ জীবনযাত্রায় তাকে আপাদমস্তক সৎ মনে করতেন। কিন্তু তার সেই সাদা শাড়িতে কালির ছিটে লাগে কারণ লোকে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তিনি দুর্নীতি না করলেও দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি তিনি। অনেকে একথা ও বিশ্বাস করেন বা মনে করেন যে নিয়োগ দুর্নীতি রেশন দুর্নীতি পুরো দুর্নীতি-সহ রাজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট তোলাবাজি ইত্যাদির কথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানতেন না তা নয় বরং তার কিছু ভাগ তাঁর জিম্মাতেও জমা পড়েছে।
এরপর আসে ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট। আগের দিনই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রয়াত হয়েছেন। তার মৃত্যুর রেশ কাটছে না কাটতেই পরের দিন আরজিকর হসপিটালে কর্তব্যরত মহিলা ডাক্তারের নারকীয় ধর্ষণ ও নিষ্ঠুর হত্যা হয়। পশ্চিমবঙ্গ এবং ভিনরাজ্য তো বটেই সারাদেশের পাশাপাশি বিদেশেও এই খবর স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সারাদেশ বিক্ষোভে উত্তাল হয় শুরু হয় রাত জাগা ও রাত পাহারা। মিছিলে মিটিংয়ে কলকাতা যেন তখন তিলোত্তমার মৃত্যুতে সত্যিই কল্লোলিনী সত্যিই মিছিল নগরী। রাজ্য সরকারের কাছ থেকে অভয়ার মৃত্যুর তদন্তের দায়িত্ব কোর্টের নির্দেশে সিবিআই কে দেওয়া হয়। কিন্তু রাজ্য সরকার এবং সিবিআই একমাত্র সঞ্জয় রায় ছাড়া এই ঘটনায় কাউকেই দোষী করে চার্জশিট দিতে পারেনি। মহানগরী গানে মুখর হয় আর কবে আর কবে চিত্ত সজীব হবে? আর কবে সমব্যথী হবে? সকলেরই মুখে তখন একটাই প্রশ্ন অভয়া তথা তিলোত্তমার মৃত্যুর সঠিক তদন্ত হয়নি। এটা কবে হবে?
তার পাশাপাশি আরজি কর হসপিটালে অন্যান্য অর্থনৈতিক দুর্নীতিও সামনে আসে সবকিছু মিলিয়ে হসপিটালগুলোতে এবং সারা রাজ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে সরব হয় মহানগরী।
এরপর আসা যাক রাজনৈতিক প্রসঙ্গে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুসলিম তোষণ সারা রাজ্যকে মেরুকরণের রাজনীতির দিকে ঠেলে দেয়। তখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। একটি সভায় তিনি বলেন একটি কমিউনিটি বা সম্প্রদায় যদি জোট বাঁধে ঘিরে ধরে তাহলে এক মিনিট লাগবে বারোটা বাজিয়ে দিতে। আমরা আছি বলে ভালো আছেন।
যদিও দীঘায় জগন্নাথ মন্দির শিলিগুড়িতে মহাকাল মন্দির নিউটাউনের দুর্গা অঙ্গন করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিছুটা ব্যালেন্স করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর উগ্র মুসলিম তোষণ নীতি কফিনের শেষ পেরেকটি পুঁতে দেয়।
এখানেই বিজেপি সুক্ষভাবে প্রচার চালায়। হ্যাঁ, তার মধ্যে অনেকটাই হিন্দুত্বের প্রচার। ২০২১ সালে বিজেপির শীর্ষ নেতা অমিত শাহ স্লোগান দিয়েছিলেন ‘ইস বার দোশো পার’। প্রধানমন্ত্রীও সহমত ছিলেন এই স্লোগানে। ২০০১-এ যেমন মমতা হয় এবার নয় নেভার স্লোগান দিয়েছিলেন যদিও তার ১০ বছর পর তার উদ্দেশ্য সফল হয়, তেমনি বিজেপি ও ২০২১ এ অনেক চেষ্টা করেও তিন থেকে ৭৭ এ বেশি আসন সংখ্যা বাড়াতে পারেনি। সবাই ভেবেছিল বিজেপি হাল ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু না আরএসএস ও বিজেপি রাজ্যে তলায় তলায় সংগঠন বাড়ানো শুরু করে। যার ফল তারা পেল ২০২৬ এর নির্বাচনে ২০৮টি আসন। তবে এই ক্ষেত্রে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর চেষ্টার কথা উল্লেখ না করলে এই লেখা অসমাপ্ত থেকে যায়। পোড়খাওয়া দুদে রাজনীতিক শুভেন্দু, বুঝেছিলেন মমতার এই মুসলিম তোষণ হিন্দুদের কোন ঠাসা করে দিচ্ছে। আর এই মানসিকতার সুযোগ নিয়ে শুভেন্দু শুরু করেন হিন্দুত্ববাদের প্রচার। এইভাবে হিন্দু ভোটকে consolidate বা একত্রিত করেন তিনি। অন্যদিকে মুসলিম ভোটের উপর নির্ভর করে বসে থাকা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংখ্যালঘু ভোটে ভাগ বসায় সিপিএম কংগ্রেস আইএসএফ এমনকি সদ্য গড়ে ওঠা হুমায়ুনের আমজনতা উন্নয়ন পার্টি। সিপিএম একটি কংগ্রেস দুটি আইএসএফ একটি এবং হুমায়ুনের দল দুটি আসন পায়। বোঝাই যাচ্ছে তৃণমূল ও বিজেপি ছাড়া অন্যান্য বিরোধীরা যারা জয়ী হয়েছেন তারা সকলেই সংখ্যালঘু। এই বিরোধীরা বেশি আসল না পেলেও মমতার সংখ্যালঘু ভোট কেটে দিয়ে বিজেপির হিন্দুত্বের ভোট কে একত্রি করনে সাহায্য করে।
তবে আমার মনে হয় কিছু রাষ্ট্রবাদী মুসলিম বিজেপিকে ভোট দিয়েছে তার কারণ মমতা ব্যানার্জি তাদের দুধেল গাই বলা, খানিকটা তাদের আত্মসম্মানকে আঘাত করে। পাশাপাশি সংখ্যালঘুরা সব সময় যারা ক্ষমতায় আসতে চায় তাদের পাশেই থাকে।
এখন প্রশ্ন হল সত্যিই কি সবাই বুঝতে পেরেছিলেন যে বিজেপি এই ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জিততে চলেছে? ২০১১ তে যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিতবেন নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল প্রায়, তেমন অশনি সংকেত কিন্তু এবারে ততটা ছিল না। এক্সিট পোলের রিপোর্ট বেশিরভাগ বিজেপির পক্ষে থাকলেও রাজ্যের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, কিন্তু বিজেপি যে আসবেই সে রকম ভবিষ্যৎবাণী খুবই কম করেছে।
কিন্তু তা সত্বেও এলো সেই পরিবর্তন। বলা যায় পরিবর্তনের পরিবর্তন বা পালাবদল। এসআইআর-কে দূর ছাই করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ডিভিডেন্ট পেতে চেয়েছিলেন তা হয়নি বরং ইলেকশন কমিশনের মৃত্যুহীন ভোট এবং স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ভোট করানোর জন্য সক্রিয় প্রয়াস এই পরিবর্তন আনাতে আরো সাহায্য করে।
এখানে আরও দুজনের নাম না বললে তাদের প্রতি সুবিচার করা হয় না। একজন হলেন সদর্থক ভাবে পরিবর্তনে সাহায্য করেছেন তিনি বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য। শিক্ষিত শমীক, শুধু যে তার তুলনামূলক অসাম্প্রদায়িক বিদগ্ধ ভূমিকায় মানুষের মন টেনেছেন তা নয় দিলীপ ঘোষের মতো নেতা বা অন্যান্য যারা পুরনো বিজেপি নেতা তাদের সঙ্গে, নতুনদের মিলেমিশ করিয়েছেন। তাই এ এই কৃতিত্ব টিম বিজেপির। প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে টিম বিজেপি অসাধারণ খেলেছে। ক্যাপ্টেন অবশ্যই ছিলেন অমিত শাহ। বারবার বাংলায় আসা বার বার বাংলার সমস্যাগুলিকে চিহ্নিত করা, এবং সংকল্প পত্রে লক্ষ্মীর ভান্ডার এর জায়গায় অন্নপূর্ণার ভান্ডার বা আরো বেশ কিছু জনমুখী প্রকল্পের অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি দেওয়া বাংলার মানুষকে ভোট বাক্সে বিজেপির বোতাম টিপতে সাহায্য করেছে।
অন্যদিকে এই ভোট রঙ্গের আরেক কুশীলব বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বলাবাহুল্য ব্যর্থ তিনি। ব্যর্থতায় অনেক কিছু পোস্টমর্টেম হয় অনেক কিছু কাটাছেঁড়া হয়।তাঁর ক্ষেত্রেও হচ্ছে তাই। দুর্নীতির অভিযোগ অনেক দিন থেকেই তার বিরুদ্ধে আছে তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল তার বিভিন্ন বক্তব্য যা তার ঔদ্ধত্যের পরিচয়বাহী। এমনিতেই তৃণমূল কংগ্রেস দলে এবং দলের বাইরে তিনি প্যারাসুটে নেমে রাজনীতিতে এসেছেন বলে সমালোচনা করা হয়। তার পাশাপাশি তার নেতৃত্বাধীন আইপ্যাক এবং তাদের নানাবিধ কার্যকলাপ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সুবিধা দেওয়ার তো দূর অস্ত সমস্যার সৃষ্টি করে। আইপ্যাক-এর অফিসে যখন কেন্দ্রীয় এজেন্সি হানা হয় তখন মমতা ব্যানার্জির সেখানে উপস্থিত হওয়া এবং প্রতীক জৈনের বাড়ি যাওয়া, ফাইল নিয়ে আসা মানুষের চোখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে অনেকটাই নিচে নামিয়ে দেয়। তাই এখন মানুষ সততার প্রতীক মমতা এই বক্তব্যে একমত নন। আর মমতা কেন্দ্রিক এই দলের বিভিন্ন জনবিরোধী সিদ্ধান্তের ফলে (রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ-র ক্ষেত্রে তঞ্চকতা-সহ আগে আলোচনা করা বিষয়গুলি) এবারের ভোট হয়ে গেছিল মমতা-বনাম জনতা। এখানেই এই লেখার প্রারম্ভে নাকভির বক্তব্যের সার্থকতা। অভিজ্ঞ রাজনীতিক যেমন ২০০৭ সালে বলেছিলেন যেভাবেই হোক কমিউনিস্টদের সরাতে হবে, প্রয়োজনে সকলে মিলে। সেই রকম এবারে মানুষ ঠিক করেছে মমতার বিকল্প আনতেই হবে। এই সরকার তোলাবাজি সিন্ডিকেট ইত্যাদি নানা অভিযোগে দীর্ণ, তাই এর পরিবর্তন ঘটাতেই হবে।
এই লেখার সময় তৃণমূল কংগ্রেসের শেষের শুরু হয়ে গেছে। বলা ভালো, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের শেষ ঘণ্টা বেজে গেছে। সাড়ে ২৮ বছরের একটি দল সাড়ে ২৮ দিনে শেষ হয়ে গেল। বিজেপি নামক বৃক্ষটিকে আশ্রয় করে তৃণমূল দল আত্মপ্রকাশ করেছিল। সেই বিজেপির বিরোধিতায় তৃণমূল দল শেষ হলো। সিপিএমের বিরোধিতা করে কংগ্রেস ছেড়ে মমতা তার নতুন দল তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেছিলেন। সেটা, ১৯৯৮ সাল। সাড়ে ২৮ বছর পর সেই কংগ্রেসেরই ছায়ায় আশ্রয় নিতে চলেছেন মমতা। অন্তত দিল্লি কলকাতার রাজনৈতিক মহলে সেই রকমই বার্তা শোনা যাচ্ছে।

Be the first to comment