Gen Z- এর সঙ্গে পাঙ্গা নয় বুঝিয়ে দিল নেপাল

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী ::
রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দক্ষিণ এশিয়া সবসময়েই আলোচনায় থাকে। এশিয়া মহাদেশের এই অঞ্চলের দেশগুলি যতই গণতন্ত্রের দাবি করুক না কেন তাদের শাসনব্যবস্থার একটি বড় প্রবণতা হল কর্তৃত্ববাদ, দুর্নীতি, পরিবারতন্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় দমননীতি। বলা যায় এগুলি তাদের শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরে প্রায় স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অঞ্চলের রাষ্ট্রশাসকেরা ক্ষমতার জোরে নিজেদের মত জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। ভাবখানা এমন যেন তিনি শাসক অতএব তার হুকুম মানতেই হবে। তিনি যা বলবেন সেটাই আইন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া এবং নেপাল- এইসব দেশে আমরা দেখলাম জনগণের ওপর ‘চাপিয়ে দেওয়া নীতি’ প্রবলভাবে প্রত্যাখ্যাত হল। অর্থাৎ জনগণের অসন্তোষ সমবেতভাবে উচ্চস্বরে বিস্ফোরিত হল। তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে তবে সেই বিস্ফোরণের মাত্রা এতটাই তীব্র ছিল যে, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এমনকি নেপালের রাষ্ট্রপ্রধান নিজের দেশ ছেড়ে গোপনে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
যে রাজাপাকসে পরিবার শ্রীলঙ্কাকে কুক্ষিগত করে রেখেছিল, তাদেরই পতন ঘটে এক তীব্র গণঅভ্যুত্থানে এবং পালাতে বাধ্য হন তখনকার প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসে, তার প্রধানমন্ত্রী ও ভাই মাহিন্দ রাজাপাকসে। তখন আর জনগণের মুখোমুখি দাঁড়ানোর কোনো অবকাশ নেই ফলে জনরোষ থেকে আত্মরক্ষা করতে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে পালানো ছাড়া আর উপায় থাকে না। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারেরও পতন ঘটে গণঅভ্যুত্থানে। তারাও জনসমর্থনের বুলি আওড়াতেন। জনসমর্থনের দোহাই দিয়ে, দম্ভ করে বিরোধী পক্ষকে হেয় করতেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে পালাতে হল। আসলে দুর্নীতি সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছিল। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গণতন্ত্র ইন্দোনেশিয়াও প্রায় একই পথে হেঁটে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। নেপালে জেনারেশন-জেড (Gen Z) তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে। আসলে সেখানেও শাসকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ। ছাত্র-যুব ও সাধারণ মানুষের প্রবল হুঙ্কারে ভয় পেয়ে যায় শাসক।
নেপালে জেন-জি তরুণদের নেতৃত্বে যে আন্দোলন তা যেন নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিল। ইঙ্গিতটি অনেকটা এই রকম- কেপি শর্মা ওলি যখন জনগণের তাড়া খেয়ে হেলিকপ্টারে চড়ে পালাচ্ছেন, আন্দোলনকারীরা যখন তীব্র আক্রোশে মন্ত্রী-আমলাদের বাড়িঘরে আগুন ধরাচ্ছে, তখন ছাত্র-যুব-আন্দোলনকারীদের মধ্যে থেকেই যেন আওয়াজ উঠছে ‘খবরদার! জেন-জির সঙ্গে পাঙ্গা নিতে এস না।’ খুব জোরে না হলেও এই আওয়াজ অনেকদিন আগেই উঠেছিল। কিন্তু ওলির সরকার তা শুনতে পায়নি, বরং তারা জেন-জি-কে তারা খেপিয়ে দেয়। তারা বুঝতেই পারেনি যে এই জেন-জি চলন হল স্মার্ট গতির। তারা সোজা কথা সোজাভাবে এবং সংক্ষেপে বলতে এবং শুনতে পছন্দ করে। স্মার্টফোনেই তারা কাজের বেশিটাই সেরে ফেলে। যে কথাটি বলতে তিনটি বাক্য লাগে, তা তারা বলে তিনটি শব্দে। যে তথ্য প্রযুক্তি, বিশেষত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম Gen Z র শ্বাস প্রশ্বাস। ওলির সরকার তা বন্ধ করে দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞায় সরকারের বক্তব্য, ভুয়া আইডি, ঘৃণামুলক বক্তব্য, ভুয়া খবর ও প্রতারণার কারণে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু আসল কারণ দুর্নীতি। নেপালের জনগণ মনে করে, দুর্নীতি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। সরকারি প্রকল্প, নিয়োগ, লাইসেন্স- সব জায়গায় দুর্নীতি। অর্থনৈতিক সংকট: প্রতিবেশী ভারতের ওপর নেপালের অর্থনৈতিক নির্ভরতা, বেকারত্ব ও দারিদ্র্য তরুণদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে।

সামাজিক বৈষম্য: রাজনীতিবিদদের পরিবার বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে, অথচ সাধারণ জনগণ দারিদ্রতায় ভুগছে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলি এই বৈষম্যকে নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে।

রাজনৈতিক অচলাবস্থা: নেপালে ক্ষমতার লড়াই এবং জোটভাঙা-জোটগড়া রাজনীতির কারণে স্থিতিশীলতা নেই। এছাড়া দুর্নীতির খবর সংবাদমাধ্যমে চলে এসেছিল। সেইসব খবর ও ছবি জেন-জিকে খেপিয়ে তুলেছিল। সরকার যখন এটা বুঝতে পারলো, তখন তারা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, এক্স—সব বন্ধ করে দিল। ইন্টারনেট বন্ধ করা বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া মানে সরাসরি তাদের গলা টিপে ধরা। কারণ সরকারের লোকজন দুর্নীতি করবে, আর সেই দুর্নীতির কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখে বা ট্রল করার সুযোগও থাকবে না—এটা জেন-জি মানতে পারে না। এই মানতে না পারা থেকেই আগুন জ্বলে উঠলো।
তবে দুর্নীতিবাজ ওলির সরকার পালিয়ে গিয়েছে বলে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ এখন সেখানে নতুন করে বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে যখন আন্দোলন চলছিল, তখন আন্দোলনকারীদের মধ্যে কোন নেতার কী নাম, কী পরিচয়; তা নিয়ে জেন-জিকে অতটা মাথা ঘামাতে দেখা যায়নি। নেপালের ঘটনাও প্রায় এক। সরকারকে হটিয়ে দেওয়ার মতো এত বড় কাণ্ড ঘটিয়ে ফেললেও কিন্তু কেউ ঠিকমতো জানে না এই আন্দোলনের মূল নেতা কে। আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহূর্ত পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা ছিল নামহীন। কেবল এইটুকু জানা তারা ‘GenZ’। কোনো দল বা ব্যক্তি এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দাবি করেনি। আন্দোলনটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দলের নাম নেই। কিন্তু একটি বিবেক-নির্ভর আন্দোলন এখন রাজতন্ত্রপন্থী এবং হিন্দুত্ববাদীরা ক্ষমতায় চলে যেতে পারে। নতুন করে সেখানে বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টি হতে পারে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*