এসআইআর গুলি না বন্দুক, তাহলে কেন এত আতঙ্ক

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী :
এ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন হতে আরও আট মাস বাকি। তার আগে নির্বাচন কমিশন গত ২৭ অক্টোবর বাংলায় এসআইআর তথা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের দিনক্ষণ ঘোষণা করে। ঠিক তার পরের দিন থেকে শুরু হয়ে যায় এসআইআর প্রক্রিয়া। কিন্তু এসআইআর ঘোষণার পর ২৪ ঘণ্টা পেরতে না পেরতেই খড়দহের পানিহাটিতে আত্মঘাতী হলেন ৫৭ বছরের প্রদীপ কর। তাঁর ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া ডায়েরিতে তিনি যে সুইসাইড নোট লিখে গিয়েছেন তাতে তিনি তাঁর মৃত্যুর জন্য এনআরসিকে দায়ী করেছেন। এমনকি তাঁর পরিবার থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, তিনি বেশ কিছুদিন এনআরসি আতঙ্কে ছিলেন, এসআইআর ঘোষণার পর সেই আতঙ্ক আরও বেড়েছিল।

পানিহাটির ঘটনার ঠিক পরের দিন ফের আত্মহত্যার চেষ্টা করেন দিনহাটার বাসিন্দা ৬৩ বছরের। তাঁর পরিবারের বক্তব্য, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় খইরুল শেখ নামের বানান ভুল ছিল। তারপর থেকেই তিনি আতঙ্কিত ছিলেন। এরপরের ঘটনা ইলামবাজারের ক্ষিতীশ মজুমদারের আত্মহত্যা, তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, ২০০২ সালের তালিকায় তাঁর নাম ছিল না। নাম না থাকায় তিনিও আতঙ্কে ভুগছিলেন।

আত্মহত্যার আরও একটি ঘটনা ঘটে ব্যারাকপুরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কেজি স্কুল রোডের মনসা মন্দিরে। ৩৩ বছর বয়সি কাকলি সরকার বাংলাদেশের নবাবগঞ্জের বাসিন্দা বিবাহ সূত্রে ১৫ বছর ধরে ভারতীয় কিন্তু তিনিও এসআইআর ঘোষণার পর আতঙ্কে আত্মঘাতী হন। এখানেই শেষ নয়, পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের পরিযায়ী শ্রমিক বিমল সাঁতরাও এসআইআর ঘোষণার পর আতঙ্কে তামিলনাড়ুতে অসুস্থ হয়ে মারা যান। এই সবকটি মৃত্যুর কারণ এসআইআর আতঙ্ক। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে এসআইআর বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে এত আতঙ্ক কেন আর এতগুলি মৃত্যুর দায় কার?
নির্বাচন কমিশন তো গোড়া থেকেই বারবার জানিয়েছে, আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই৷ তা সত্ত্বেও মানুষের মনে এত আতঙ্ক বা গভীর উদ্বেগ তৈরি হল কীভাবে? অন্যদিকে আরও একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, বাংলায় এসআইআর ঘোষণার পরেই সীমান্ত লাগোয়া অঞ্চলগুলিতেও দেখা গেল অধিকাংশ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। অনেককেই ভারত ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরতে দেখা যায়। প্রতিদিন ভোর থেকেই সীমান্তে ভিড় জমাতে শুরু করে। কারা ওরা? বলা হচ্ছে ওরা এদেশে থাকা ‘অবৈধ’ বাংলাদেশি। ইতিমধ্যেই ওঁদের মধ্যে অনেকেই ভারত ছেড়ে বাংলাদেশ পালাতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছেন৷ ওঁদের মধ্যে কেউ এদেশে এসেছিলেন কাজের খোঁজে। কেউ আবার আত্মীয়ের বাড়িতে এসে এদেশেই থাকবেন বলে ভোটার কার্ড এবং আধার কার্ড বানিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হতেই আতঙ্কে ভারত ছেড়ে পালাতে শুরু করেছেন। কেন আতঙ্ক? এখনও কী সাধারণ মানুষ এসআইআর কী তা জানেন?

এ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের আট মাস আগে প্রক্রিয়া শুরু, প্রক্রিয়াটি আসলে কী, কীভাবে সেটি হবে, কেন এই প্রক্রিয়া? কোনো প্রশ্নের কোনো উত্তর কী কারও কাছে স্পষ্ট বা নির্ভুল ভাবে জানা আছে? অধিকাংশ মানুষেরই সঠিক উত্তর জানা নেই। আতঙ্ক তো সেখান থেকেই শুরু আর আতঙ্কের ফল মৃত্যু। যে মৃত্যুর তালিকায় আছেন হিন্দু, মুসলমান সবাই। এসআইআর নিয়ে রাজনৈতিক তুমুল হট্টগোল চলছে তবু একথা তো ঠিক এসআইআর-এ মানুষ ভয় পেয়েছে, আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
বাংলার মানুষ যে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রসঙ্গত, এই রাজ্যের বিরাট সংখ্যক হিন্দুদের যেমন ভিটেমাটি ছেড়ে আসার যন্ত্রণাদায়ক অভিঙ্গতা আছে তেমনি এই রাজ্যের বাঙালি মুসলমানদেরও রয়েছে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদী লক্ষ্য হয়ে ওঠার প্রবল চাপ। তাছাড়া গত জুন মাসে বিহারে এসআইআর প্রক্রিয়ার শুরু থেকে নির্বাচন কমিশনের সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের আতঙ্কিত হওয়া ছাড়া আর কী কোনো উপায় আছে? অন্যদিকে হিন্দুত্ববাদী দল জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে মুসলমান ‘অনুপ্রবেশ’-এর কথা বলে চলেছে। ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর কেন্দ্রীয় সরকার ভারতের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে এনআরসি তৈরির বিষয়টি নাগরিকত্ব আইনের আওতায় নিয়ে আসেন। এমন একটি রাজনৈতিক দল যখন দেশের ক্ষমতায় থাকে, তখন মুসলমানদের মনে নিরাপত্তা কোথা থেকে আসবে।এসআইআর শুরুর আগে বাংলা থেকে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশি মুসলমান সন্দেহে মহারাষ্ট্র, রাজস্থান বা দিল্লি থেকে বাংলাদেশে ‘পুশ ব্যাক’ করার অভিযোগ উঠতে থাকে। হরিয়ানা, ওডিশার মতো রাজ্য থেকে বাংলাদেশি সন্দেহে পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্থা করা হয়। উল্লেখ্য, হেনস্থার মূল শিকার বাঙালি মুসলমানরা হলেও, বাঙালি হিন্দুদেরও বাংলাদেশি সন্দেহে হেনস্থা, গ্রেফতার, ‘পুশ ব্যাক’-এর ঘটনা ঘটনা ঘটে। এরপর বিজেপি নেতারা তো দিবারাত্র বলে চলেছেন, ভোটার তালিকায় বহু অনুপ্রবেশকারীর নাম ঢুকে আছে, এসআইআর দিয়ে তাদের বাদ দেওয়া হবে। আসামে বছর কয়েক আগে নাগরিকপঞ্জি তৈরির সময়ে বহু বাঙালি ‘বিদেশি’ হিসাবে চিহ্নিত হয়, তার মানে আতঙ্কের ভিত্তি আগেই তৈরি ছিল।
মানুষের আতঙ্ক ভোটার তালিকায় নাম থাকা বা না-থাকা নয়, যেহেতু ভোটার তালিকায় নাম থাকাটা নাগরিক পরিচয়ের অন্যতম প্রমাণ, তাই তালিকায় নাম না থাকার বিপদকে তারা নাগরিকত্ব হারানোরই বিপদ হিসাবে দেখছে। মানুষ বুঝেছে এসআইআর অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়, একটি বর্জনমূলক প্রক্রিয়া, তাই আতঙ্কিত। এ দেশের শাসক ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে দেশ থেকে ঘাড় ধাক্কা দেবে, তাই আতঙ্ক। মানুষ নির্ভুল ভোটার তালিকা চায়। কিন্তু তার জন্য এসআইআর-এর কী প্রয়োজন। বাপ ঠাকুরদা’র ঠিকুজি কুষ্ঠি দিয়ে কী হবে। কেনই বা ২০০২ এর ভোটার তালিকা ভিত্তি, ২০১৯, ২০২১ বা ২০২৪-এর ভোটার তালিকা নয় কেন? ব্যাঙ্ক, প্যান, আধার কার্ড কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও মান্যতা নয় কেন? এটা ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন না ভোটার বিতারণ?

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*