তপন মল্লিক চৌধুরী :
চার দশক পেরিয়ে গিয়েছে, ভোপাল কী সেই ভয়াবহ গ্যাস দুর্ঘটনার প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্তি পেয়েছে, না কি তার বিষক্রিয়ায় এখনও ভুগছে ভোপালবাসী? প্রাক্তন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ জানাচ্ছেন, ১৯৮৪ সালের ২ ডিসেম্বর রাতে ভোপালের ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানা থেকে যে বিষাক্ত গ্যাস লিক হয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল তার প্রভাব বয়ে বেড়াচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। সেই রাতে ঘুমের মধ্যেই অনেকের মৃত্যু হয়েছিল, পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছিল আরও অনেকের। সব মিলিয়ে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার সাতশো সাতাশি জনের। কিন্তু বেসরকারি মতে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি। সব মিলিয়ে বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষের নানা ধরনের শারীরিক ক্ষতি হয়। তবে সেখানেই শেষ নয়, কয়েক প্রজন্ম ধরে ওই অঞ্চলের মানুষ বয়ে বেড়াচ্ছেন ভয়াবহ দুর্ঘটনার প্রভাব। সেই রাতের দুর্ঘটায় অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের সন্তানের উপর বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাব পড়তে পারে কি না, তা নিয়ে অনেক জলঘোলা হয়েছিল। কিন্তু সব জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছিল ইউনিয়ন কার্বাইড। যদিও ওই প্রাক্তন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ জানান, সেই সময় দুর্ঘটনায় মৃত গর্ভবতী মহিলাদের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছিল, মায়ের দেহে পাওয়া বিষাক্ত পদার্থের অন্তত ৫০ শতাংশ মিলেছে গর্ভস্থ ভ্রূণেও। আর যে সব মা বেঁচে গিয়েছিলেন, পরবর্তী কালে তাঁদের শিশুর স্বাস্থ্যেও থাবা বসিয়েছে বিষাক্ত গ্যাসের কুপ্রভাব। এখনও প্রজন্মের পর প্রজন্ম তার ফল ভোগ করছে।

বিপর্যয়ের ৪০ বছর পেড়িয়ে ভোপাল কতটা বদলেছে? স্পষ্ট উত্তর; ভোপাল এখনও সেই বিপর্যয়ের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। পুরনো ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানার অঞ্চলটিতে এখনও সেই ট্র্যাজেডির একটি ভুতুড়ে স্মৃতি রয়ে গিয়েছে। পরিবেশগত সংস্কারের পরও বহু মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বেশ কিছু ধরনের সমস্যা রয়ে গিয়েছে। পরিত্যক্ত ইউনিয়ন কার্বাইড প্ল্যান্টে এখনও বিষাক্ত বর্জ্য রয়েছে, যা আশেপাশের বাসিন্দাদের জন্য ক্ষতিকারক। চলতি বছরের গোড়াতেও বর্জ্য পরিষ্কারের চেষ্টা বিক্ষিপ্তভাবে হয়েছে, কর্তৃপক্ষ ৩৩৭ মেট্রিক টন বিষাক্ত বর্জ্য পিথমপুর শহরে অপসারণ করে। যদিও পরিস্কার করার কাজে যুক্ত কর্মীরা জানান যে এটি ফেলে আসা বিপজ্জনক পদার্থের একটি অংশ মাত্র। পুরোপুরি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে অঞ্চলটি একটি বিপজ্জনক অবস্থায় পরিণত হয়েছে আর এই কারণে ভোপালে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত অবস্থা উদ্বেগজনক। সচেতনতা এবং প্রচার সত্ত্বেও, দীর্ঘমেয়াদী দূষণের কারণে ভোপালের বাসিন্দারা স্বাস্থ্যগত জটিলতায় ভুগছেন। শহরের কিছু অংশের জল এবং মাটিতে এখনও বিপজ্জনক রাসায়নিকের উপস্থিতি রয়ে গিয়েছে। অনেক আক্রান্ত ব্যক্তি যথাযথ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
সবথেকে দুঃখজনক বিষয় ভোপাল দুর্ঘটনার ৪০ বছর পরেও অনেক ভুক্তভোগী এখনও ক্ষতিপূরণ পাননি। যদিও ১৯৮৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ইউনিয়ন কার্বাইড কর্পোরেশন $470 মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ জমা দেয়, কিন্তু তা ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছানো বা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে দেরি হওয়া এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেকেই এখনও ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত রয়ে গিয়েছেন। প্রশ্ন কেন ক্ষতিপূরণ পেতে এত সময় লাগছে? বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়া, দুর্ঘটনাটি ছিল একটি জটিল আইনি এবং প্রশাসনিক বিষয়। ক্ষতিপূরণ বিতরণের জন্য বিশেষ আইন তৈরি করা হয়েছিল, যেমন ‘ভোপাল গ্যাস লিক ডিজাস্টার (দাবি প্রক্রিয়াকরণ) আইন, ১৯৮৫’। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দায়িত্ব ছিল সরকারের উপর। কিন্তু দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক স্তরে জটিলতার কারণে ক্ষতিপূরণ দেওয়াটা একটি দীর্ঘ মেয়াদী কাজে পরিণত হয়। সেইসঙ্গে অনেকেই মনে করেন যে মোট ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ভুক্তভোগীদের প্রকৃত ক্ষতি পূরণের জন্য যথেষ্ট ছিল না।

এইসব কারণে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের হয়ে বহুদিন ধরেই আন্দোলন করেছেন মধ্যপ্রদেশের একাধিক সংগঠন। তারা একটি বিবৃতি জারি করে বলেন, ভেপাল গ্যাস দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের দিনের পর দিন অবহেলা করছে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার। ভোপাল গ্রুপ ফর ইনফরমেশন অ্যান্ড অ্যাকশন থেকে জানা যাচ্ছে, এখনও ওই গ্যাস দুর্ঘটনায় গ্যাসের বিষক্রিয়ায় ভুগছেন মানুষ। সুপ্রিম কোর্ট ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিতসার জন্য যেসব নির্দেশ দিয়েছিল তার ৮০ শতাংশও পূরণ করা হয়নি। উপরন্তু ওই খাতে খরচের জন্য যে টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল তা ব্যবহার করা হয় রাস্তা, নর্দমা ইত্যাদি তৈরি করতে। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের হয়ে আন্দোলনকারী গ্যাস পীড়িত মাহিলা স্টেশনারি কর্মচারি সংঘ থেকে জানা যায়, এখনও পর্যন্ত ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানার দূষণ আসপাশের ৪২টি বস্তিতে ছড়িয়েছে। যার মোকাবিলায় সরকার কিছুই করেনি। কেবল তাই নয়, ৪০ বছর পরও গ্যাস দুর্ঘটনায় পঙ্গু মানুষদের চিকিতসার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্লেখ্য, ভোপালের বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউনিয়ন কার্বাইড প্ল্যান্ট থেকে বিষাক্ত বর্জ্য অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে অনেক দেরিতে। আজও ওই এলাকার মাটি এবং ভূগর্ভস্থ জল দূষিত এবং রাসায়নিকের উপস্থিতি রয়েছে, যার ফলে ভুক্তভোগীরা দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যা ভোগ করছেন।

Be the first to comment