পর্দায় অভিনয়ের থেকেও চিত্রনাট্য অমিতাভকে বেশি সুপারস্টার করেছে

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী :

সাধারণত সেলুলয়েডে দু’রকম ব্যক্তিত্বের দেখা মেলে প্রথমজন তারকা আর পরের জন অভিনেতা। তারকাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছেন যাদের চেহারা এবং আকর্ষণ দর্শকদের মন কেড়ে নেয়। পাশাপাশি এমন অভিনেতা আছেন যার অভিনয় দক্ষতা আছে কিন্তু তিনি তারকা হওয়ার শুভেচ্ছা বা আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত। এরপর আছেন অমিতাভ বচ্চন। পর্দায় তাঁর অনন্য উপস্থিতি, অবিরাম তীক্ষ্ণ আচরণ, স্বতন্ত্র মেজাজ এবং অবশ্যই তাঁর ট্রেডমার্ক ব্যারিটোন কণ্ঠস্বর-এই সব মিলিয়েই তিনি একজন সুপারস্টার হয়ে ওঠেন। তবে তাঁর অভিনয় ক্ষমতা প্রসঙ্গে একথাই বলতে হয় যে তিনি নিজেকে প্রায় গিরগিটির মতো নানা চরিত্রে রূপান্তরিত করতে পারেন। যদি তাঁর কেবল পর্দার ক্যারিশমা থাকত এবং ব্যতিক্রমী অভিনয় প্রতিভা না থাকত, তাহলে তিনি কী একজন বড় তারকা হতেন, নাকি নিজস্ব ক্যারিশমা ছাড়া তিনি একজন চরিত্র অভিনেতা হিসেবে সফল হতে পারতেন? মনে হয় অমিতাভ বচ্চনের মধ্যে দুরকম গুণই খুব বেশিই ছিল, যা তাঁকে ভারতীয় সিনেমার সেরা ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে, হয়ত সেই কারণেই ফরাসি চলচ্চিত্রকার ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো বলিউদ সিনেমা ও অমিতাভ বচ্চনকে “এক-ব্যক্তি শিল্প” বলেছিলেন।

ভারতীয় সিনেমায় বেশ কয়েকজন সফল থ্রিস্পিয়ান এবং অসাধারণ জনপ্রিয় তারকা রয়েছেন কিন্তু এমন কেউ নেই যিনি এতদিন ধরে একই ধারায় টিকে থাকতে পেরেছেন। প্রায় ৪৫ বছরের দীর্ঘ ইনিংসের বেশিরভাগ সমযয়েই তিনি অন্যান্যদের থেকে বেশি জনপ্রিয়। অথচ শুরুর দিকে অর্থাৎ ৭০ এবং ৮০ এর দশকে, অমিতাভ বচ্চনকে তার চরিত্রের জন্য ‘লুক’-এর প্রয়োজন ছিল না। কোনও প্রস্থেটিক্স বা মেকআপ ছিল না, সাধারণত ক্লিন-শেভড, ট্রেডমার্ক হেয়ারস্টাইল এবং তার নিজস্ব পুরুষালী কন্ঠে সংলাপ। বরং তিনি বেশি মনোযোগী ছিলেন পারফর্মেন্সের দিকে- পরিবেশনের ধরণ, চলাফেরা, ওঠা-বসা এবং পোশাকের ধরণ, এমনকি তিনি কীভাবে সিগারেট ধরবেন তার উপর। কোনো উপস্থাপনা কখনও উপর থেকে চাপানো মনে হয়নি, বরং মনে হত যেন তিনি সেই চরিত্রগুলির মধ্যে আছেন। তাই সেই মুহূর্তে যা ঘটত বা ঘটছে তাকে বাস্তব বলে মনে হত। বিষয়টিকে গুরুত্বহীন ভাবার কোনো কারণ বা ছোট করে দেখা যায় না কারণ তাঁর সময়ের পক্ষে তা ছিল বিরল।

খাজা আহমেদ আব্বাসের ‘সাত হিন্দুস্তানি’ (১৯৬৯) অমিতাভ বচ্চনের প্রথম ছবি, উৎপল দত্ত,  জালাল আগা, আনোয়ার আলি প্রমুখ অভিনেতার পাশে আনোয়ার আলি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অমিতাভ বচ্চন। বক্স অফিসে ছবিটি মার খায়। যদিও এই ছবিতেই আনোয়ার আলীর চরিত্রে অভিনয় করে অমিতাভ বচ্চন শ্রেষ্ঠ নবাগত অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। এরপর হৃষিকেশ মুখার্জীর ‘আনন্দ’ ছবিতে ডক্টর ভাস্কর ব্যানার্জীর চরিত্রে অভিনয় করে তিনি শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব চরিত্র অভিনেতা ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান। এরপরের ছবিগুলি ‘পেয়ার কি কাহানি’,   ‘পারওয়ানা’, ‘রেশমা অর শেরা’, ‘সঞ্জোগ,  ‘গুড্ডি’, ‘পিয়া কা ঘর’, ‘বোম্বে টু গোয়া’, ‘বংশী বিরজু’, ‘এক নজর’,  ‘রাস্তে কা পাথর’, ‘গরম মশলা’, ‘জবান’,  ‘বন্দে হাত’, ‘গেহেরি চাল’ প্রভৃতি ছবিগুলির কোনোটাই তাঁর অভিনয় জীবনের পক্ষে অনুকূল ছিল না। ছবিগুলিও বক্স অফিসে যেমন ঝড় তুলতে ব্যর্থ পাশাপাশি অভিনেতা হিসাবেও অমিতাভ বচ্চন নিজেকে প্রমান করতে না পেরে কলকাতায় ফিরে যাওয়ার জন্য প্রায় তৈরি হয়ে গিয়েছিলেন। কলকাতায় তিনি একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছিলেন এবং কয়েকটি নাটকে অভিনয়ও করেছিলেন।

একথা বলাই যায় যে যদি চিত্রনাট্যকার জুটি সেলিম-জাভেদ (সেলিম খান এবং জাভেদ আখতার) “জঞ্জির” ছবির জন্য এবং বলা বাহুল্য অমিতাভ বচ্চনের জন্য অ্যাংরি ইয়ং ম্যান চরিত্রটি তৈরি না করতেন, তাহলে তার মতো একজন অভিনেতার সেলুলয়েড স্বপ্ন হয়তো কখনোই বাস্তবায়িত হত না। ১৯৭৩ সালে প্রকাশ মেহরা পরিচালিত এই ছবিটিতে ওই প্রোটোটাইপ চরিত্রটির নামও দেওয়া হয়েছিল বিজয়। পরবর্তীকালে একাধিক ছবিতে অমিতাভ বচ্চন এই নামটি গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭০-এর দশক দেশের বিভিন্ন জায়গা অস্থির হয়ে উঠেছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা জারির ফলে স্বাধীনতা পরবর্তী দেশের কোথাও কোথাও পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছিল। সেলিম-জাভেদের লেখা বিজয় ওরফে অমিতাভ বচ্চন চরিত্রটি ছিল সেই সময়ের। অমিতাভ বচ্চন দুর্দশার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠেন এবং তার জনপ্রিয়তা হিন্দি সিনেমায় প্রাধান্য বিস্তার করে। ১৯৭৫ সালে যশ চোপড়ার “দিওয়ার” ছবিতেও সেলিম-জাভেদের চিত্রনাট্যে ফের বিজয় চরিত্রটি আত্মপ্রকাশ করে- একজন রাগান্বিত যুবক যা ভারতীয় পর্দায় খুব কমই দেখা যায়।”দিওয়ার: দ্য ফুটপাথ, দ্য সিটি” এবং “দ্য অ্যাংরি ইয়ং ম্যান” বইয়ের লেখক বিনয় লাল লিখেছেন যে “দিওয়ার” হিন্দি সিনেমার প্রথম ছবি যেখানে “ফুটপাথ এবং আকাশচুম্বী ভবনের মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, এই দুটিই চলচ্চিত্রের নগর ভূদৃশ্যের প্রধান লক্ষণ”।

“দিওয়ার”-এর পর রমেশ সিপ্পির “শোলে” (১৯৭৫)-তেই অমিতাভ বচ্চনের ক্যারিয়ার পঞ্চম গিয়ারে চলে যায়। তবে ১৯৮০ এর দশকের শেষার্ধে তাঁর ক্যারিয়ার গ্রাফ অনেকটাই নীচের দিকে নেমেছিল। তবে একথা বলতেই হবে যে অমিতাভ বচ্চন হওয়ার গুরুত্ব কেবল তার ক্যারিয়ারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, যদিও তিনি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন এবং তার ভূমিকা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন এবং অনেক সফল ছবিতে অভিনয় করেছেন। ১৯৮৪ সালে তাঁর বন্ধু প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর নির্দেশে সংসদ সদস্য হন। কিন্তু তিন বছর পর হতাশ হয়ে পদত্যাগ করেন। ১৯৯৫ সালে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এবং চলচ্চিত্র প্রযোজনার জন্য অমিতাভ বচ্চন কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করেন, কিন্তু এখানেও তিনি ব্যর্থ হন। এক পর্যায়ে প্রায় দেউলিয়া হয়ে গিয়েও ফিরে আসেন ব্রিটিশ গেম শো হু ওয়ান্টস টু বি আ মিলিয়নেয়ারের উপর ভিত্তি করে টিভি গেম শো কৌন বনেগা ক্রোড়পতি থেকে।  সত্তরের দশকে অমিতাভ বচ্চন নিজেকে “রাগী যুবক” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পর তিনি সেই চরিত্র আর চিত্রনাট্যেই অভিনয় করতে পেরেছেন আর সেটাই দর্শক দেখতে চেয়েছিল।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*