তপন মল্লিক চৌধুরী :
দলিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে কেক কেটে জন্মদিন পালন? নিচু জাতের ছেলে অনিকেত জাঠবের এতবড় স্পর্ধা মেনে নিতে পারেননি উঁচু জাতের ঠাকুররা। তাই বন্ধুদের সঙ্গে কেক কেটে বার্থ ডে সেলিব্রেট করার অপরাধে পিটিয়ে খুন করা হয় বছর কুড়ির ওই দলিত যুবককে। ঘটনাস্থল উত্তরপ্রদেশের গ্রেটার নয়ডার রবুপুরা এলাকা। দলিত নিগ্রহের ঘটনা অবশ্য উত্তরপ্রদেশে প্রথম নয়। গত ২ অক্টোবর এই রাজ্যার রায়বরেলিতে ফতেপুরের বাসিন্দা হরিওম বাল্মীকিকে গণপিটুনি দিয়ে খুন করা হয়। জাতীয় ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে দলিতদের উপর অত্যাচারের হারে সব থেকে এগিয়ে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাট ও বিহার। পাঁচ রাজ্যেই সরাসরি বিজেপি অথবা শরিকদের সঙ্গে মিলে শাসন ক্ষমতায় রয়েছে। দেশে নির্যাতন ও বৈষম্যের হাত থেকে দলিতদের রক্ষায় আইন আছে তারপরও সরকারি হিসেব অনুসারে শুধু ২০১৬ সালেই তাদের উপর ৪০ হাজারেরও বেশি অপরাধের পুলিশ রিপোর্ট আছে।
মধ্যপ্রদেশে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে সিধি জেলায় এক আদিবাসী ব্যক্তির মুখের উপর প্রস্রাব লরে স্থানীয় বিজেপি নেতা প্রবেশ শুক্লা। পরিসংখ্যান বলছে বিজেপি সরকারের আমলে দেশে আদিবাসী ও দলিতদের উপর অত্যাচার হু হু করে বেড়েছে। অতীতেও দলিতদের উপর অত্যাচার ছিল, জমিজমা, বেতন বা মজুরি, জল, রাস্তা, ঘরবাড়ি ইত্যাদি ঘিরে সমাজের তথাকথিত উচ্চ বর্ণের সঙ্গে দলিতদের সংঘর্ষ হত, শেষমেশ প্রাণ যেত দলিত মানুষদের। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে দলিতদের উপর অত্যাচার বৃদ্ধি পেয়েছে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আশা আকাঙ্ক্ষা তৈরি হওয়ার কারণে। কতগুলি ঘটনায় সেই বাস্তবতা ফুটে ওঠে।
২৪ বছরের এক ছাত্র সাগর সেজওয়াল তাঁর দুই ভাইয়ের সঙ্গে একটি মদের দোকানে মদ কেনার সময় তার মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। তাঁর ফোনের রিং টোন ছিল আম্বেদকারকে শ্রদ্ধা জানিয়ে। কয়েকজন লোক সাগর সেজওয়ালকে রিং টোন পালটাতে বলায় তর্ক বাঁধে এবং সেখান থেকে মারামারি। ওই লোকজন সেজওয়ালকে বোতল দিয়ে আঘাত, ঘুষি ও লাথি মেরে একটি মোটরবাইকে তুলে নিয়ে চলে যায়। কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশ একটি মাঠ থেকে সেজওয়ালের মৃতদেহ উদ্ধার করে।ময়না তদন্তে দেখা যায়, তার শরীরের বিভিন্ন জায়গাযর হাড় ভাঙা। পুলিশের ধারণা, তাকে মাটিতে শুইয়ে শরীরের উপর মোটরবাইক উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তরা পরে জামিনে মুক্তি পায়। এর আগে পুনেতে ২৫ বছর বয়সী মানিক ওদাগেকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। তাঁর অপরাধ তিনি আম্বেদকারের জন্মবার্ষিকীতে একটি বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। ওই এলাকায় বহু উচ্চবর্ণের বাস, তাঁরা ওই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিলেন। স্কুলে উচ্চবর্ণের একটি মেয়ের সঙ্গে কথা বলায় খাদরা গ্রামের ১৭ বছর বয়সী কিশোর নিতিন আগেরকে মেরে গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ওই ঘটনায় অভিযুক্তরা আদালত থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। দলিত হয়েও সঞ্জয় দানান স্কুলে কাজ করতেন এই অপরাধে উচ্চবর্ণের সহকর্মীরা তাকে হত্যা করে এমনভাবে মরদেহ ঝুলিয়ে দিয়েছিল যাতের মনে হয় সে আত্নহত্যা করেছে। এই ঘটনায় পুলিশ ১৮ জনকে গ্রেফতার করেছিল, তাদের মধ্যে কয়েকজন শিক্ষকও ছিলেন। কিন্তু সবাই জামিন পায়। খরায় গ্রামের কুয়ার জল শুকিয়ে গিয়েছিল, গ্রামের কাউন্সিল বিভিন্ন এলাকায় জল সরবরাহ করলেও দলিতরা যে এলাকায় থাকেন সেখানে কোনো ব্যবস্থা হয়না। ১০ বছরের কিশোরী রাজশ্রী কাম্বলে উচ্চবর্ণের লোকেদের এলাকায় ঢুকে জল নিতে গেলে তার মাথায় এমন আঘাত করা হয় যে সে প্রাণ হারায়। তার বাবা গ্রামের মাতব্বরদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে গেলেও সেটি নেওয়া হয়না। তাঁর জমির পাশে ছিল উচ্চবর্ণের একাধিক মানুষের জমি কিন্তু তা স্বত্বেও মাধুকর ঘাদজে নিজের জমিতে একটি কুয়া খনন করেছিলেন। উচ্চবর্ণের লোকেরা তাঁকে হত্যা করে। অভিযুক্ত ১২ জনই খালাস পায়। এই সবকটি ঘটনাই ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে, কখনও গুজরাট অথবা উত্তরপ্রদেশ অথবা মধ্যপ্রদেশ কিংবা রাজস্থানে।
ন্যাশনাল ক্রাইম রিসার্চ ব্যুরোর প্রতিবেদন অনুযায়ী দলিতদের বিরুদ্ধে অত্যাচার বেড়েছে অন্ততপক্ষে ২৫ শতাংশ। দলিতদের উপর অত্যাচার করে সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে উঁচু তলার মানুষ। তাই দলিত সম্প্রদায়ের লোকদের পক্ষে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা অসম্ভব হয়ে যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুলিশও মামলা নিতে চায় না। মামলা করলেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে দলিতদের তা প্রত্যাহার করতে হয়। বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে জানা যাচ্ছে, দেশে দলিত সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রতি ১৫ মিনিটে একটি করে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। প্রতিদিন দলিত সম্প্রদায়ের ছ’জন মহিলা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। বিগত কয়েক বছরে দেশে দলিত নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে ৬৬ শতাংশ। দেশের শেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত ৬০ শতাংশ মানুষ কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারছেন না। যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের ৫৫ শতাংশই কৃষিকাজে জড়িত। দলিত পরিবারের শিশুদের ৫৩.৬ শতাংশই অপুষ্টিতে ভোগে। একই সঙ্গে স্যানিটেশন ও বিশুদ্ধ জল ব্যবহারের সুযোগ পান ২০ শতাংশেরও কম মানুষ। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা লাভের ক্ষেত্রেও দলিতরা বৈষম্যের শিকার। দলিতরা দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ নামের সংগঠনের উচ্চবর্ণের হিন্দু শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের ভয়ে সিটিয়ে থাকেন। দেশের রাষ্ট্রপতি দলিত হলেও এসব বিষয়ে একেবারে নিশ্চুপ থাকেন।

Be the first to comment