রমিত সরকার, কৃষ্ণনগর :
কৃষ্ণনগর শহরে প্রবেশ করলেই যে শিশু উদ্যানটি প্রথম চোখে পড়ে, তার নাম মহারাজা ক্ষৌনিশ চন্দ্র উদ্যান। স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ক্ষৌনিশ পার্ক নামে। এক সময় এই পার্কই ছিল শহরের বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র। আজ সেই উদ্যান পড়ে আছে অবহেলায়, কার্যত মৃতপ্রায় অবস্থায়।
শহরের পুরনো পার্কগুলোর মধ্যে ক্ষৌনিশ পার্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ২০১৩ সালে তৎকালীন পৌরসভার তত্ত্বাবধানে একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে পার্কটি পুনরায় সাজানো হয়। তার পর থেকেই যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছিল এই উদ্যান। শিশু থেকে যুবক-যুবতী—সকলের কাছেই বিকেলের সময় কাটানোর প্রিয় জায়গা হয়ে উঠেছিল ক্ষৌনিশ পার্ক। শিশুদের খেলার নানা সরঞ্জাম, ফুড কোর্টসহ সব ধরনের পরিকাঠামোই ছিল পার্কের ভেতরে।
এই পুনরুজ্জীবনের সুফল শুধু পার্কে আসা মানুষজনই পাননি। পার্কের বাইরেও বহু মানুষ তাঁদের রোজগারের রাস্তা খুঁজে পেয়েছিলেন। কেউ বেলুন নিয়ে দাঁড়াতেন গেটের সামনে, কেউ আইসক্রিম বা খাবারের গাড়ি নিয়ে। বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল ক্ষৌনিশ পার্ক।

কিন্তু করোনা অতিমারির সময় শহরের অন্যান্য উদ্যানের মতো ক্ষৌনিশ পার্কও বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার ফলে পার্কের ভেতরে জঙ্গল গজাতে শুরু করে, নষ্ট হতে থাকে শিশুদের খেলার সরঞ্জাম। ধীরে ধীরে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে কোথাও দোলনায় চেন আছে, বসার জায়গা নেই; আবার কোথাও বসার জায়গা থাকলেও চেন নেই। বর্তমানে পার্কের চেহারা কার্যত শোচনীয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙাচোরা সরঞ্জামগুলি বেশিদিন পার্কে পড়ে থাকে না। কিছুদিনের মধ্যেই সেগুলি উধাও হয়ে যায়। সেই জিনিসগুলি কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের দাবি, পার্ক সংলগ্ন একটি বাড়ি থেকে ওই ভাঙা সরঞ্জাম ভাঙাড়িদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
এক স্থানীয় নাগরিক বলেন, “আমি রোজ আমার মেয়েকে নিয়ে এখানে আসতাম। ও খেলত, খুব আনন্দ পেত। এখন শহরে বাচ্চাদের খেলার জায়গা এমনিতেই কম। এই পার্কটা ওকে কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও খোলা হাওয়া দিত। আমরা চাই আবার পার্কটা খুলুক।”

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই উদ্যানটি তিনটি ওয়ার্ডের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত। বিষয়টি জানতে তিনজন কাউন্সিলরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রত্যেকেই জানান, পার্কটি তাঁদের ওয়ার্ডের অন্তর্গত নয়। কার্যত দায় এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠছে জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে। ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জানান, “আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পার্কটিকে ভগ্নপ্রায় অবস্থায় দেখছি। তবে যেহেতু এটি পুরোপুরি আমার ওয়ার্ডের মধ্যে পড়ে না, তাই আমি কোনও মন্তব্য করব না। শুনেছি এখানে আইনি জটিলতা রয়েছে, তাই আইনের উপরই ভরসা রাখছি।”

এই প্রসঙ্গে কৃষ্ণনগর পৌরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান রিতা দাস জানান, ২০২২ সালে পৌরসভার দায়িত্বভার গ্রহণের পর শহর সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। “সেই সময় ক্ষৌনিশ পার্ক পুনর্গঠনের জন্য ইঞ্জিনিয়ার পাঠিয়ে মাপঝোক করা হয়। কীভাবে পার্কটিকে আরও ভালো করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়। পার্কের পাশ দিয়ে ‘আই লাভ কৃষ্ণনগর’ লেখা বসানোরও পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কিছু স্থানীয় মানুষ ব্যক্তিস্বার্থে আপত্তি তোলেন, একটি ক্লাবকে উস্কে দিয়ে কাজে বাধা দেন। পরে বিষয়টি আইনি মামলায় গড়ায়, যার ফলে কাজ করা সম্ভব হয়নি,” বলেন তিনি।

বর্তমান কৃষ্ণনগর পৌর প্রশাসক ও মহকুমা শাসক শ্বরদুতি চৌধুরী জানান, প্রশাসন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। “আইনি জটিলতা যতদিন না কাটছে, ততদিন এই পার্কে কোনও কাজ করা সম্ভব নয়। তবে যত দ্রুত সম্ভব পার্কটিকে তার পুরনো মর্যাদায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে,” বলেন তিনি।
এদিকে স্থানীয় কিছু মানুষের দাবি, রাতের বেলায় পার্কের ভেতরে অসামাজিক কার্যকলাপ চলে। অভিযোগ উঠেছে, পার্ক সংলগ্ন একটি বাড়ির নির্মাণ সামগ্রী এই উদ্যানে মজুত করে রাখা হয়েছে। অথচ এই পার্কে injunction জারি রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সেই অবস্থায় কীভাবে পার্কের ভেতরে নির্মাণ সামগ্রী রাখা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই শিশু উদ্যানের এমন পরিণতিতে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দাদের বড় অংশ। তাঁদের একটাই দাবি—শিশুদের খেলার জায়গা এভাবে বন্ধ করে রাখা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পাশাপাশি, কিছু ক্ষমতাশালী স্বার্থান্বেষী মহলের ভূমিকার কড়া সমালোচনাও করছেন তাঁরা।

Be the first to comment