কৃষ্ণনগর উত্তরে প্রার্থীহীন বিজেপি, জমি ফেরাতে মরিয়া তৃণমূল-বাম—জমে উঠছে ভোটের লড়াই

Spread the love

রমিত সরকার, কৃষ্ণনগর:
বিগত সাত বছরে নদিয়ার কৃষ্ণনগর উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের রাজনৈতিক সমীকরণ আমূল বদলে গিয়েছে। একসময় ডানপন্থী ভোটব্যাঙ্কের উপর নির্ভরশীল এই কেন্দ্রে বর্তমানে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে বিজেপি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাম ভোটের বড় অংশ বিজেপির দিকে সরে যাওয়াই এই উত্থানের অন্যতম কারণ।

গত লোকসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর উত্তর বিধানসভা এলাকায় প্রায় ৫৩ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, নির্বাচন দোরগোড়ায় পৌঁছলেও এখনও পর্যন্ত এই কেন্দ্রে প্রার্থী ঘোষণা করতে পারেনি গেরুয়া শিবির। ফলে জেতা আসনেই প্রার্থী বাছাই নিয়ে চাপে পড়েছে বিজেপি নেতৃত্ব।

দলীয় সূত্রে কখনও শোনা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী-র ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক উপদেষ্টাকে প্রার্থী করা হতে পারে। আবার কখনও উঠে আসছে কল্যান চৌবে-র নাম। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় এখনও পর্যন্ত মাঠে নামেননি বিজেপি প্রার্থীরা। এতে করে কর্মী-সমর্থকদের একাংশের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলেই মত রাজনৈতিক মহলের।

অন্যদিকে, এই সুযোগে মাঠে নেমে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট। তৃণমূল পুরনো জমি পুনরুদ্ধারে জোর দিচ্ছে, আর বাম শিবির মরিয়া হয়ে উঠেছে হারানো ভোটব্যাঙ্ক ফেরাতে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে বিজেপির ভোট শতাংশ ছিল মাত্র ১৪। কিন্তু ২০১৯ ও ২০২৪ লোকসভা এবং ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের পর সেই হার ৫৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছে। বিপরীতে, তৃণমূলের ভোট ২০১৬ সালের ৪৪ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে প্রায় ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে।

গত লোকসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর শহরের ২৫টি ওয়ার্ড মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে দলের দৃশ্যমান অনুপস্থিতি প্রশ্ন তুলছে রাজনৈতিক মহলে।

এদিকে, বামফ্রন্টের প্রার্থী অদ্বৈত বিশ্বাস ইতিমধ্যেই জোরকদমে প্রচারে নেমে পড়েছেন। পঞ্চায়েত থেকে পঞ্চায়েতে ঘুরে জনসংযোগ করছেন তিনি। দোগাছি পঞ্চায়েতের সুভাষনগর, জালালাখালি থেকে শুরু করে ভাণ্ডারখোলার জাভা বাজার—সব জায়গাতেই মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন।

প্রচারের ফাঁকে তিনি বলেন, “মানুষের মধ্যে ভালো সাড়া পাচ্ছি। পরিবর্তনের একটা হাওয়া তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার সুবাদে অনেকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে, সেটাও কাজে লাগছে।”

বাম শিবিরের এক কর্মীর কথায়, “অনেকদিন পর আমরা সিপিএম প্রার্থী পেয়েছি। কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা এসেছে। এখন মূল লক্ষ্য মানুষকে বোঝানো এবং যারা দূরে সরে গিয়েছেন তাঁদের ফেরানো।”

অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস এই কেন্দ্রে নতুন মুখ অভিনব ভট্টাচার্য-কে প্রার্থী করেছে। তিনি ইতিমধ্যেই শহরের ৮, ৯, ১০, ১১ ও ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে নিবিড় জনসংযোগ করেছেন। পাশাপাশি দলীয় কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করে সংগঠন মজবুত করার দিকেও নজর দিচ্ছেন।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, কৃষ্ণনগর উত্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে আরও অভিজ্ঞ বা হেভিওয়েট প্রার্থী দিলে তৃণমূলের লড়াই আরও শক্তিশালী হতে পারত।

কৃষ্ণনগর-১ ব্লকের তৃণমূল সভাপতি সুশান্ত মণ্ডল দাবি করেন, “মানুষ বিজেপিকে আর বিশ্বাস করছে না। বিভিন্ন ইস্যুতে মানুষের ক্ষোভ রয়েছে, তার প্রতিফলন ভোটবাক্সেই দেখা যাবে।”

সব মিলিয়ে, প্রার্থী ঘোষণায় দেরি করে বিজেপি যেখানে কিছুটা চাপে, সেখানে সুযোগ কাজে লাগাতে মরিয়া তৃণমূল ও বামফ্রন্ট। নির্বাচন যত এগোচ্ছে, ততই জমে উঠছে কৃষ্ণনগর উত্তর বিধানসভার রাজনৈতিক লড়াই।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*