বিহার কা এক হি স্টার, দশমবার মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী : 
নির্বাচনে তিনি নন প্লেয়ার। কেবল এবারের বিহার বিধানসভা ভোট নয়, ২০ বছর ভোটে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন নি। তা স্বত্বেও বিহার বিধানসভা নির্বাচনে এনডিএ জোটের চোখধাঁধানো জয়ের পর, যার মধ্যে ৮৯ টি আসনে জয়লাভ করে বিজেপি বৃহত্তম দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে আর শরিক নীতিশ কুমারের নেতৃত্বাধীন জনতা দল ইউনাইটেড পেয়েছে ৮৫ টি আসন। কিন্তু টানা দশমবার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হলেন নীতিশ কুমার। তাঁর এই রাজনৈতিক কৌশলকে অনেকেই ‘নন প্লেয়িং ক্যাপ্টেন’ মডেল বলে অভিহীত করেন। ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করেও কীভাবে তিনি টানা ক্ষমতায়? কেনই বা তিনি ক্ষমতায় থাকার জন্য এমন কৌশলকে বেছে নিয়েছেন বিহারের রাজনীতিতে আজ সেটি আলোচ্য বিষয়। প্রসঙ্গত, নীতীশ কুমার কিন্তু টানা ছ’বার লোকসভা ভোটে লড়েছেন- ১৯৮৯, ১৯৯১, ১৯৯৬, ১৯৯৮, ১৯৯৯, ২০০৪ সালে। ২০০৪ সালে নীতিশ কুমার বিহারের বাঢ় ও নালন্দায় লোকসভা কেন্দ্র থেকে লড়লেও বাঢ় থেকে তিনি হেরে যান। সেই বছরই তিনি শেষবার ভোটের মাঠে নেমেছিলেন। এর পর ২০০৫ সালের নভেম্বর থেকে, মাত্র নয় মাস বাদ দিলে, টানা বিহারের মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু বিহারের হারনৌত বিধানসভা থেকেই নীতিশ কুমারের রাজনৈতিক জীবনের শুরু।১৯৮৫ সালে হারনৌত কেন্দ্র থেকে জিতে নীতিশ কুমার বিধায়ক হন। এরপর ১৯৯৫ সালে ওই কেন্দ্র থেকে ফের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তিনি পরাজিত হন। এরপর থেকেী নীতিশ বিধানসভা নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে পুরোপুরি সড়ে দাঁড়ান। যদিও লোকসভায় তিনি লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন।
ভোটের যুদ্ধে থেকেও কেন নিজে ভোটে নামেন না সে ব্যাখ্যা অবশ্য নীতিশ নিজেই দিয়েছেন, একবার নয় একাধিকবার। ২০১২ সালে তিনি বলেছিলেন, তিনি নিজের ইচ্ছেতেই বিধান পরিষদের সদস্য হয়েছেন। কোনও বাধ্যবাধকতা ছিল না। বিধান পরিষদ অত্যন্ত সম্মানজনক প্রতিষ্ঠান বলেই তিনি মনে করেন। ফের আরও একবার ২০১৫ সালে বিহার ভোটের সময় তিনি আরও স্পষ্ট করে ভোটে না লড়ার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, বলেন— যদি তিনি নিজে প্রার্থী হন, তাহলে তাঁর ধারনা ফোকাস শুধু তার আসনের মধ্যেই আটকে যাবে। দল ও জোটের নেতা হিসেবে সেটা করা ঠিক নয়। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী নিজের নির্বাচনী লড়াইয়ের চাপ এড়িয়ে গোটা রাজ্যের প্রচার ও নির্বাচনী কৌশলে তিনি মনসংযোগ করতে চান।
রাজনৈতিক বিশেষঙ্গেরা অবশ্য বলেন বিধান পরিষদ হল নীতীশের রাজনৈতিক নিরাপত্তা বলয়। বিহারে বিধান পরিষদ (Legislative Council) রয়েছে। যেটি বিধানসভার উচ্চকক্ষ। দলগুলি বিধানসভা নির্বাচনে যে পরিমাণ আসন জেতে, তার ভিত্তিতে পরিষদের সদস্য বাছাই হয়। কেউ বিধান পরিষদের সদস্য হলেই তিনি মন্ত্রী হতে পারেন। নীতিশও একটানা কুড়ি বছ্র সেই পথেই মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। আসলে বিধান পরিষদের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী হওয়াটা তাঁকে অনেক বেশি নিরাপদে রাখে বা তিনি নিরাপদে থাকেন। কারণ এই পথ তাঁকে নির্বাচনের হার জিতের যে ঝুঁকি তার থেকে পুরোটাই নিশ্চিন্তি দেয়, তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীর যে কোনো রকম আক্রমণ বা সমালোচনা থেকে অনেকটাই দূরে থাকতে পারেন এবং নিশ্চিন্ত মনে রাজ্যজুড়ে নির্বাচনী প্রচারে সময় দিতে পারেন এবং অবশ্যই বিরোধীরা পরাজিত হলে সরকারে নিশ্চিত ভাবে হাজির হতে পারেন। বলা যায় এটাই নীতিশের রাজনৈতিক কৌশলের মূল ভিত্তি। আর এই কৌশল অবলম্বন করেই তিনি ২০ বছর ভোটে না লড়াই করেও দশমবার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হলেন।
নীতিশ যে তাঁর এই কৌশলে নিজের ক্ষমতাকে ধরে রাখতে পুরোপুরি সফল হয়েছেন সে কথা মানতে হবে। গত ২০ বছরে তিনি একাধিকবার জোট বদল করেছেন, কখনও এনডিএ, আবার কখনও মহাগঠবন্ধন, আবার এনডিএ—তবু তিনিই বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। এটা কেবল নিজের কৌশলের সাফল্য বা ধারাবাহিকতা নয়, রাজনীতিতে ক্ষমতা নিয়ে টিকে থাকার পারদর্শিতা-র একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ২০২৫-এর বিহার বিধানসভা ভোটেও নীতিশ ছিলেন এনডিএ জোটের মুখ, কেবল তাই নয়, প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুও ছিলেন তিনি। ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন নি ঠিকই কিন্তু ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার আগে বা পরে কে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হবেন তা নিয়ে যে বা যারা জল্পনা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন তাদের সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে তিনিই আবার ক্ষমতা শীর্ষে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির বিপুল জয়ের পর, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে রাজনৈতিক মতবিরোধ হওয়ায় তিনি পদত্যাগ করেন। জিতন রাম মাঝি অল্প সময়ের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করেন, কিন্তু মাঝি বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়ার পর, ২০১৫ সালে নীতিশ ফিরে আসেন এবং পরে লালু প্রসাদ যাদবের আরজেডির সাথে জোট করে শক্তিশালী জনাদেশ অর্জন করেন। এরপর ২০১৭ সালে আবার তিনি এনডিএতে ফিরে আসেন। “সুশাসন বাবু” নামে পরিচিত জেডিইউ-র এই প্রবীন নেতা আবার প্রমাণ করলেন যে “বিহার কা এক হি স্টার, নিতীশ কুমার’।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*