জলদস্যুর ভয় থেকে দেবীর আরাধনা, ৩৫০ বছরেও অমলিন কৃষ্ণনগরের (Krishnanagar) গোলাপট্টি বারোয়ারির মহিষমর্দিনী পুজো

Spread the love

রমিত সরকার, নদীয়া : Krishnanagar : 

জলঙ্গি নদীকে ঘিরেই একসময় জমজমাট ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য। নদীপথে নৌকা চলাচল, পণ্য পরিবহণ আর বণিকদের আনাগোনায় মুখর থাকত নদীর ঘাট। তবে সেই বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আতঙ্কও। কথিত আছে, একসময় জলঙ্গি নদীতে জলদস্যুদের উপদ্রব ছিল প্রবল। আর সেই দস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পেতে গোয়ারী অঞ্চলের বণিকরা দেবী মহিষমর্দিনীর শরণাপন্ন হয়েছিলেন। সেই বিশ্বাস থেকেই শুরু হয়েছিল দেবীর আরাধনা। সময়ের স্রোতে কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও সেই পুজো আজও বহমান।

কৃষ্ণনগরের জলঙ্গি নদীর ঘাট সংলগ্ন গোলাপট্টি এলাকার বারোয়ারি মহিষমর্দিনী পুজো সেই প্রাচীন ঐতিহ্যেরই স্মারক। উদ্যোক্তাদের দাবি, প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ বছরের পুরনো এই পুজো আজও একই নিষ্ঠায় অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিকে কেন্দ্র করে চার দিন ধরে চলে দেবীর আরাধনা। বাংলা পঞ্জিকার হিসেব অনুযায়ী সাধারণত আগস্ট মাসের তৃতীয় থেকে চতুর্থ সপ্তাহের মধ্যে এই পুজো অনুষ্ঠিত হয়।

পুজোর বিশেষত্ব শুধু তার প্রাচীনত্বে নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লোকবিশ্বাস এবং সামাজিক অংশগ্রহণেও। পুজো আয়োজকদের অন্যতম অমল লাহা জানান, স্থানীয় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অনুদানেই এই পুজোর আয়োজন করা হয়। আলাদা করে কারও কাছ থেকে চাঁদা তোলা হয় না। এলাকার মানুষের সহযোগিতাই বছরের পর বছর ধরে এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে।

তবে এই পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও নানা স্মৃতি। এলাকার এক প্রবীণ বাসিন্দার কথায়, তাঁর শৈশবে মহিষমর্দিনী পুজোকে কেন্দ্র করে মাসব্যাপী মেলা বসত। কলকাতা থেকেও বড় বড় শোভাযাত্রা আসত। তাঁর স্মৃতিতে এখনও অমলিন বিখ্যাত ধাপ কীর্তন শিল্পী কমলা ঝরিয়ার নাম—তাঁকেও নাকি এই পুজোর আসরে ধাপ কীর্তন পরিবেশন করতে দেখা গিয়েছিল।

গোলাপট্টির মহিষমর্দিনী প্রতিমারও রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। সিংহবাহিনী দেবীর দুপাশে থাকেন জয় ও বিজয়। প্রবীণদের স্মৃতিতে রয়েছে আরও একটি হারিয়ে যাওয়া প্রথা। একসময় এলাকার দুই সুন্দরী তরুণীকে জয় ও বিজয়ের সাজে সাজিয়ে শোভাযাত্রায় বের করা হতো। সময়ের পরিবর্তনে সেই প্রথা আজ আর নেই। একইভাবে হারিয়ে গেছে একসময়ের দীর্ঘ মেলা, জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রা এবং নানা আয়োজন।

কালের নিয়মে পুজোর জৌলুস কিছুটা ম্লান হলেও বন্ধ হয়নি দেবীর আরাধনা। বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয় মানুষ এই পুজোর সঙ্গে নিজেদের আবেগ ও বিশ্বাসকে জড়িয়ে রেখেছেন। বর্তমান উদ্যোক্তারাও চান, হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনতে। পুরনো প্রথাগুলির মধ্যে যেগুলি সম্ভব, সেগুলি একে একে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁদের।

একসময় যে জলঙ্গি নদী ছিল বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র, সেই নদীর ঘাটের কাছেই আজও জ্বলছে কয়েক শতাব্দী পুরনো বিশ্বাসের প্রদীপ। জলদস্যুর ভয় থেকে দেবীর আশ্রয় নেওয়ার যে লোককথা একদিন এই পুজোর সূচনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল, আজ তা শুধু ধর্মীয় আচার নয়—কৃষ্ণনগরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

সময়ের সঙ্গে নদীর চরিত্র বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা, হারিয়ে গেছে বহু পুরনো প্রথা। কিন্তু গোলাপট্টির মহিষমর্দিনী পুজো এখনও মনে করিয়ে দেয়—ঐতিহ্য শুধু মন্দির বা প্রতিমার মধ্যে থাকে না, তা বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতি, বিশ্বাস, গল্প আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এগিয়ে চলা অংশগ্রহণের মধ্যেও।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*