সমুদ্র সৈকতে এক তরুণকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে জনা কয়েক আদিবাসী। তারা প্রায় নগ্ন, হাতে তীর-ধনুক, চোখে প্রতিহিংসা। তীর বিঁধে রয়েছে তরুণের শরীরেও। কিছুক্ষণ সে ভাবেই হাঁটার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন তরুণ, তারপর ধপ করে তাঁর দেহটা পড়ে গেল বালির উপর। রক্তাক্ত দেহটাকে তখন টেনে বালির ভিতরে চাপা দিয়ে রেখে জঙ্গলে ফিরে গেল আদিবাসীরা। নৌকায় বসে এই দৃশ্য দেখে ততক্ষণে হাড়হিম হয়ে গেছে সাত মৎস্যজীবীর।
আন্দামানের নিষিদ্ধ নর্থ সেন্টিনেল দ্বীপ। বিপজ্জনক উপজাতিদের বাস বলে এই দ্বীপের ত্রিসীমানাও পার হন না কেউ। সেই দ্বীপেই পা ফেলেছিলেন মার্কিন পর্যটক জন অ্যালেন চাও। তারই মাশুল দিতে হল নিজের প্রাণ দিয়ে। মার্কিন পর্যটক হত্যাকাণ্ডে ফের একবার খবরের শিরোনামে আন্দামানের নর্থ সেন্টিনাল। এর আগে ২০০৬ সালে দুই মৎস্যজীবী তাদের শিকারে পরিণত হয়েছিল।
পুলিশ জানিয়েছেন, ঘটনাটা গত শুক্রবারের। আন্দামানে বেড়াতে এসেছিলেন জন। এর আগেও বহুবার এসেছেন। তবে সেন্টিনেলে পা দেননি। উপজাতিদের সম্পর্কে জানার অধীক আগ্রহেই এই দ্বীপে তাঁকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য মৎস্যজীবীদের অনুরোধ করেন। প্রথমে তাঁরা রাজি না হলেও পরে তরুণের একান্ত অনুরোধকে উপেক্ষা করতে পারেননি। স্থানীয় এক মৎস্যজীবীর কথায়, দক্ষিণ আন্দামানে পা দেওয়ার পর থেকেই সেন্টিনেল দ্বীপে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন জন। বর্তমানে আন্দামানের ২৯টি দ্বীপে প্রবেশের ক্ষেত্রে ছাড়পত্র দিয়েছে সরকার। যার মধ্যে রয়েছে নর্থ সেন্টিনেলও। পর্যটনের প্রসারের জন্যই এমন সিদ্ধান্ত।
শুক্রবার সকালে নৌকায় চাপিয়ে তাঁকে দ্বীপের কাছে নিয়ে যান মৎস্যজীবীরা। সৈকতে পা দেওয়া মাত্রই তাঁদের ঘিরে ধরে উপজাতিরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায়, আগে থাকতেই দ্বীপের দিকে একটি নৌকাকে আসতে দেখে জলে নেমে দাঁড়িয়েছিল কয়েকজন সেন্টিনেলিজ (নর্থ সেন্টিনেল দ্বীপের এই আদিম উপজাতি)। প্রত্যেকের হাতে ছিল তীর-ধনুর, বর্শা। জন এগিয়ে গিয়েছিলেন অনেকটাই সামনে। তাঁকেই আগে পাকড়াও করে উপজাতিরা। বাকিরা পালিয়ে যান নৌকায়। সেখান থেকেই তাঁরা দেখেন, তরুণের দিকে পর পর তীর ছুড়ছে উপজাতিরা। তীরবিদ্ধ অবস্থাতেই হাঁটার চেষ্টা করছেন তরুণ। কিন্তু পালাতে পারলেন না। তার আগেই তাঁর দিকে উড়ে এল দড়ির ফাঁস। গলায় দড়ি পেঁচিয়ে টেনে-হিঁচড়ে তরুণের দেহটা বালি চাপা দিয়ে রাখল কয়েক জন সেন্টিনেলিজ। ফিরে এসে জনের বন্ধু অ্যালেক্স ও পুলিশকে এমনই তথ্য জানিয়েছেন মৎস্যজীবীরা।
পুলিশ জানিয়েছে, পোর্ট ব্লেয়ার থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরত্বে ওই দ্বীপ। কিন্তু তাও এই দ্বীপে আধুনিক সমাজের লেশমাত্রও পৌঁছতে পারেনি। এই দ্বীপে প্রবেশের অনুমতিও নেই কারও। তাই দ্বীপের ভিতর ঢুকে পর্যটককের দেহ খুঁজে বার করা একপ্রকার অসম্ভব ব্যাপার। তবে, হেলিকপ্টার নামিয়ে অনুসন্ধান চলছে। মৎস্যজীবীদের কথা মতো ঘটনার পরের দিন হেলিকপ্টার নিয়ে দ্বীপের আদ্যপান্ত খুঁজেও জনের দেহ দেখা যায়নি। সৈকতের বালিতেও কোনও মৃতদেহ ছিল না। দেহটা নিয়ে আদিবাসীরা ঠিক কী করেছে, সেটা এখনও বোঝা যাচ্ছে না।

Be the first to comment