লোকসভায় বন্দেমাতরম আলোচনার অনেক আগেই ছিল বিতর্ক

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী : 

জাতীয় গান ‘বন্দেমাতরম’-এর সার্ধশতবর্ষ। গোড়া থেকেই বঙ্কিমের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের এই গানটি নিয়ে বিতর্ক ছিল। দেড়শো বছর ছুঁয়েও সেই বিতর্ক ফের একবার উসকে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি বুধবার শীতকালীন অধিবেশন চলাকালীন ‘বন্দেমাতরম’ নিয়ে ১০ ঘন্টার আলোচনা শুরু করেন। অবশ্য এই আলোচনা কেবলমাত্র মানুষের নজর ঘোরাতে নেহরু ও কংগ্রেসকে আক্রমন। প্রসঙ্গত, গানটি রচনার দু’বছর পরে রমেশচন্দ্র দত্ত ‘Encyclopaedia Britannica’-তে লেখেন, “The poem, then, is the work of a Hindu idealist who personified Bengal under the form of a purified and spiritual Kali.” কৃষ্ণ কৃপালানী ‘Bande Mataram and Indian Nationalism’ শিরানামে ‘Visva Bharati News’ (October, 1937)-তে লেখেন, “…this song gives to my love of my country. Though one can have no sympathy with the fanaticism of some Bengali Mahommedans who are out to smell idolatory in all literary use of Hindu mythology” সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত ‘বঙ্কিম প্রসঙ্গ’ বইতে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লিখেছেন, প্রথম যখন তিনি বন্দেমাতরম গানটি শোনেন তখন শ্রোতাদের কেউ কেউ গানটির সংস্কৃত অংশের কিছু কিছু জায়গা সম্পর্কে অভিযোগ তুলে বলেন, ওই অংশগুলি অত্যন্ত শ্রুতিকটু হইয়াছে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লিখছেন, সেই আসরে বঙ্কিম উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে ধীরে ধীরে সব শুনে বলেন, ‘আমার ভাল লেগেছে তাই লিখেছি, তোমাদের ইচ্ছা হয় পড় না হয় ফেলে দাও না হয় পড় না’।
কলকাতা এআইসিসি অধিবেশনে ‘বন্দেমাতরম্’ সংগীত নিয়ে যে একটা তুমুল ঝড় উঠবে এই কথা আগেই বুঝতে পেরেছিলেন সুভাষচন্দ্র। তিনি চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে রবীন্দ্রনাথকে কবির সুচিন্তিত অভিমত লিখে জানানোর অনুরোধ করে চিঠি লেখেন। রবীন্দ্রনাথ সুভাষচন্দ্রকে লেখেন- “বন্দেমাতরং গানের কেন্দ্রস্থলে আছে দুর্গার স্তব এ কথা এতই সুস্পষ্ট যে এ নিয়ে তর্ক চলে না। আনন্দমঠ উপন্যাসটি সাহিত্যের বই, তার মধ্যে এই গানের সুসংগতি আছে। কিন্তু যে রাষ্ট্রভাষা ভারতবর্ষের সকল ধর্ম সম্প্রদায়ের মিলনক্ষেত্র সেখানে এ গান সর্বজনীনভাবে সংগত হতেই পারে না। বাংলাদেশের একদল মুসলমানের মধ্যে যখন অযথা গোঁড়ামির জেদ দেখতে পাই তখন সেটা আমাদের পক্ষে অসহ্য হয়। তাদের অনুকরণ করে আমরাও যখন অন্যায় আব্দার নিয়ে জেদ ধরি তখন সেটা আমাদের পক্ষে লজ্জার বিষয় হয়ে ওঠে। বস্তুত এতে আমাদের পরাভব।” রবীন্দ্রনাথ নেহরুর কাছেও ‘বন্দেমাতরম্’ নিয়ে তাঁর অভিমত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তিনদিন আলাচনার পর কমিটি বন্দেমাতরম্ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয় যে, এই সংগীতের প্রথম অংশটিই কংগ্রেসের সভাসমিতিতে গাওয়া হবে। সিদ্ধান্তের মর্মার্থে বলা হয় “‘বন্দেমাতরম’ সংগীত সম্পর্কে একটি বিতর্ক উঠিয়াছে; সুতরাং ওয়ার্কিং কমিটি এই সংগীতটির মর্মার্থ ব্যাখ্যা করা আবশ্যক বিবেচনা করছেন। ‘আনন্দমঠ’রচনার আগেই এই সঙ্গীত রচিত, পরে ‘আনন্দমঠ’-এর অন্তর্ভুক্ত হয়; সুতরাং ‘বন্দেমাতরম্’সঙ্গীতের কথা বিবেচনায় ‘আনন্দমঠ’উপন্যাসের কথা বিবেচনা না করলেও চলে। প্রসঙ্গত, রবীন্দ্রনাথের পরামর্শ অনুযায়ী গানটির প্রথম দুই স্তবক জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়।
রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৬ সালে ‘বন্দেমতরম’-এ সুর সংযোগ করেন। ব্রিটিশ সরকার ‘বন্দেমাতরম’কথাটি এবং সঙ্গীতটিকে রাজদ্রোহীতা ঘোষণা করে। ওই বছর কলকাতায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে ‘বন্দে মাতরম’ গানটি প্রথম গাওয়া হয়েছিল এবং সেদিন রবীন্দ্রনাথ নিজে গানটি পরিবেশন করেছিলেন। উল্লেখ্য, ১৮৮২ সালে যখন প্রথম ‘আনন্দমঠ’ বই হয়ে বেরোয় (কলকাতার জনশন প্রেস) তখন গানটির নীচে টীকা ছিল, মল্লার রাগ। কাওয়ালি তাল। সুর দিয়েছিলেন যদুভট্ট। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বন্দে মাতরম-এর স্বরলিপি প্রকাশ করেন ‘দেশ’রাগে। ‘আনন্দমঠ’-এর পরের সংস্করণেই (দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছিলেন হুগলির উমাচরণ বন্দোপাধ্যায়, লক্ষী নারায়ণ দাস ছিলেন মুদ্রক) লেখা হয়, দেশ রাগ। তবে ‘বন্দেমাতরম’ শ্লোগান হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নি সরলা দেবীর সৌজন্যে। স্বদেশি আন্দোলনের সময় ময়মনসিংহের সুহৃদ সমিতি মিছিল করে সরলা দেবীকে বক্তৃতামঞ্চে তুললে তিনি ‘বন্দে মাতরম্ আওয়াজ তোলেন। তখন থেকেই সর্বভারতীয় স্লোগান হয়ে ওঠে বন্দে মাতরম। সরলা দেবী ‘বন্দেমাতরম’ গানটির প্রথম দুটি স্তবক বাদ দিয়ে বাকি অংশে সুর দিয়েছিলেন, যা ময়মনসিংহ সুহৃদ সমিতির ছেলেদের মাধ্যমে প্রথম প্রচলিত হয় এবং তিনি নিজেও গেয়ে গানটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এরপর তিনি ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় বারাণসীতে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সম্মেলনে গোটা গানটি গেয়েছিলেন। মঞ্চে ছিলেন লেডি অবলা বসু।
বঙ্কিম রচিত বন্দেমাতরম নিয়ে এরপর প্রশ্ন তোলেন বঙ্কিম গবেষক অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য (৭ নভেম্বর, ২০০৬, আনন্দবাজার পত্রিকা)। তাঁর প্রশ্ন, “ বন্দেমাতরম কি বঙ্কিমেরই লেখা”। তাঁর বক্তব্যের নির্যাস হল, তাঁর গানটির প্রথম ১২টি পংক্তিকে “বন্দে মাতরম্ সুজলাং সুফলাং … বহুবলধারিণীং নমামি তরিণীং রিপুদলবারিণীং মাতরম্” কেন উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছিলেন? অন্যের রচনা ছাড়া নিজের রচনার কথা সাধারণত উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখা হয় না, তাহলে কি প্রথম ১২টি পংক্তি তাঁর নিজের রচনা নয়, পরের ১৬টি পংক্তি তাঁর নিজের রচিত? যদিও দেখা যায় বঙ্কিম তাঁর একাধিক উপন্যাসে একাধিক চরিত্রের মুখে গান বসিয়েছিলেন, উল্লেখযোগ্য- ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসের বারোটি গান, এর মধ্যে দুটি গান উপন্যাসের নায়িকা ‘মৃণালিনী’-র গলায় আর বাকি দশখানি গান গেয়েছেন গিরিজায়া। গিরিজায়া গায়; “মথুরাবাসিনি, মধুরহাসিনি, শ্যামবিলাসিনি-রে।/ কহ লো নাগরি, গেহ পরিহারি, কাঁহে বিবাসিনি- রে”, “যমুনার জলে মোর, কি নিধি মিলিল।/ঝাঁপ দিয়া পশি জলে, যতনে তুলিয়া গলে,/পরেছিনু কুতুহলে, যে রতনে”, “ঘাট বাট তট মাঠ ফিরি ফিরনু বহু দেশ।/ কাঁহা মেরে কান্ত বরণ, কাঁহা রাজবেশ”। ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে “সাধের তরণী আমার কে দিল তরঙ্গে”, “শ্রীমুখপঙ্কজ—দেখবো বলে হে,/ তাই এসেছিলাম এ গোকুলে।/ আমায় স্থান দিও রাই চরণতলে”, “কাঁটাবনে তুলতে গেলাম কলঙ্কের ফুল,/ গো সখি কাল কলঙ্কেরি ফুল”। ‘ইন্দিরা’তে “একা কাঁখে কুম্ভ করি, কলসীতে জল ভরি,/ জলের ভিতরে শ্যামরায়”। তাহলে কি গান, কবিতা কিংবা অন্য কথা নিজের রচনা হলেও তা উদ্ধৃতির মধ্যেই রাখতেন বঙ্কিম।
প্রসঙ্গত, পুলক চন্দের বই ‘ভিন্ন পাঠে বন্দেমাতরম ও একটি দুস্প্রাপ্য কাব্যগ্রন্থ’-এর উল্লেখ করতেই হয়। এই বইতে লেখক তাঁর আবিষ্কৃত কবি বিজয়লাল দত্তের কাব্যগ্রন্থ ( ১২৯৪ অথবা ১৮৮৭ সালে রচিত ও প্রকাশিত) ‘জাগো আমার মা’ কাব্যগ্রন্থে ‘বন্দেমাতরম’ গানটির ২৮টি পংক্তি উদ্ধৃতির মধ্যে রেখেছেন। কবি বিজয়লাল অবশ্য রচয়িতার নাম উল্লেখ করেন নি।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*