তপন মল্লিক চৌধুরী :
পুরুলিয়া জেলার সবথেকে প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক দুর্গাপুজো হল কাশীপুর রাজবাড়ির (Kashipur Rajbari) পুজো। বহু বছর ধরে রাজ পরিবারের রাজ রাজেশ্বরী কুলদেবীর পুজো ঐতিহ্য আর রীতিনীতি মেনে আজও চলে আসছে। এক সময়ের জাঁকজমকপূর্ণ পুজো কালের নিয়মে কিছুটা জৌলুস হারালেও দেবীর আরাধনায় ভাঁটা পড়েনি। অনেকেই বলেন এই দুর্গাপুজো কয়েকশো শতাব্দী পুরোনো এবং এই ঐতিহাসিক পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু গল্প।
পুরুলিয়া (purulia) স্টেশন থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে এই প্রাসাদটি নির্মিত হয়েছিল ১৯১৬ সালে। তখন পুরনো পুরুলিয়ার পঞ্চকোট রাজ্যের রাজধানী ছিল কাশিপুর। মুর্শিদাবাদের নবাব ওয়াসিফ আলী মির্জা, কাশীপুরের (kashipur) প্রথম রাজা মহারাজা নীলমনি সিং দেওকে প্রচুর স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। এছাড়া ব্রিটিশ সরকারও তাকে “কাশিপুরের রাজা বাহাদুর” উপাধি দিয়েছিল। এই রাজপরিবারের শেষ রাজা ছিলেন মহারাজা ভুবনেশ্বরী প্রসাদ সিং দেও। তারপর থেকে রাজবংশের উত্তরাধিকারীরা এই প্রাসাদে বসবাস করে চলেছেন এবং রাজপরিবারের ঐতিহ্য মেনে কুলদেবীর পুজো করে চলেছেন। অন্য মত, এই কাশীপুর রাজপরিবার আসলে পঞ্চকোট রাজবংশের শেষ একটা রাজপরিবার।
কয়েকশ বছর আগে পঞ্চকোট পাহাড়ের পাদদেশে এই রাজবংশ বসবাস করত। সেখান থেকে বর্গিরাজাদের আক্রমণের পর কাশীপুরের (kashipur) যিনি মহারাজা ছিলেন উনি রঘুনাথপুর পালিয়ে আসেন সপরিবারে; এবং তারপর থেকে এখানেই অর্থাৎ পুরুলিয়ার কাশিপুরে পুরোপুরি ভাবে অবস্থান করেন। তারপর ধীরে ধীরে সাম্রাজ্য বিস্তার করেন ও কাশীপুরের এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন ও সপরিবারে বসবাস শুরু করেন। অনেকে মনে করেন আজ থেকে প্রায় দু’হাজার বছর আগে দামোদর শেখর সিং দেও চাকলা পঞ্চকোট রাজত্ব স্থাপন করেন। সেই দিন থেকে তিনি এই দুর্গাপূজার শুরু করেন।

কথিত আছে কাশীপুরের তৎকালীন রাজা কল্যান শেখর রাজা বল্লাল সেনের মেয়ে সাধনাকে বিয়ে করে সঙ্গে যৌতুক হিসেবে কালো ঘোড়া ও রাজ তরবারি নিয়ে রানি সাধনার আবদার মতো কুলদেবীকে নিয়ে কাশীপুরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। ইতিমধ্যে রাজা বল্লাল সেনের ছেলে লক্ষণ সেনের কাছে খবর পৌঁছায়, তাঁদের কুলদেবীকে দিদি সাধনা নিয়ে যাচ্ছেন শশুরবাড়ি কাশীপুরে।
খবর পাওয়া মাত্র লক্ষণ সেন কুলদেবীকে ফিরিয়ে আনতে সৈন্যসামন্ত নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। মাঝপথেই লক্ষণ সেন ও রাজা কল্যাণ শেখরের মধ্যে যুদ্ধ হয়। একথা জানতে পেরে রানি সাধনা কুলদেবীকে একটি গুহার মধ্যে লুকিয়ে ফেলেন। কিন্তু যুদ্ধে হেরে লক্ষণ সেন খালি হাতে ফিরে যেতে বাধ্য হন। আর তাঁর দিদি রানি সাধনা কুলদেবীকে সঙ্গে নিয়ে শ্বশুরালয়ে ফিরে যেতে চান। কিন্তু ততক্ষনে কুলদেবী প্রতিষ্ঠা হয়ে গিয়েছে শবনপুরে যা বর্তমানে কল্যানেশ্বরী মন্দির। দেবী জানান তিনি এই গুহা থেকে আর যাবেন না। এই কথা শুনে ধর্নায় বসে পড়েন রাজা কল্যাণ শেখর ও রানি সাধনা। তাঁদের দেখে দেবী সাধনাকে বলেন, “তুই কাশীপুর যা। আমি তোর পুজো নিতে কাশীপুর যাবো।”
কুলদেবীর কথা শুনে রানি সাধনা বলেন, “দেবী আপনার উপস্থিতি জানব কী ভাবে?” দেবী জানান, “আমাকে প্রতিষ্ঠা করিস। মহাষ্টমীতে একটি সোনার থালায় সিঁদুর রাখবি। আমার পায়ের ছাপ পড়বে তাতে। জানবি আমি তোর পুজো নিতে এসেছি।” সেই থেকে চলে আসছে কাশীপুর রাজ পরিবারের শ্রী শ্রী রাজ রাজেশ্বরী মাতার পুজো। সেই থেকে নিয়ম রীতি মেনে আজও এই পুজো চালিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান কাশীপুরের রাজ পরিবারের সদস্যরা। রাজবাড়িতে রাজেশ্বরী মাতার পুজো হয় ১৬ দিন ধরে। কাশীপুর রাজপরিবারের কুলদেবী এখানে অষ্টধাতুর চতুর্ভূজা। এই পুজো দেখতে বহু মানুষ ভীর করেন দুর-দূরান্ত থেকে। এবারও প্রথা মেনে থালায় সিঁদুর রাখা হবে বন্ধ ঘরে। শোনা যায় কাশীপুর রাজবাড়িতে অধিষ্ঠিত দেবী রাজ-রাজেশ্বরীর পুজো হয় বারোমাসই।

রাজবাড়িতে সপ্তমীর রাত্রে হয় মহাশক্তির আরাধনা, যা এই রাজবাড়ীর পূজোর অন্যতম বৈশিষ্ট। এখন বলিপ্রথা সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ। বৈষ্ণব মতে হয়ে থাকে পূজোর যাবতীয় আয়োজন। পুজোর ক’দিন দেবীকে নিরামিষ অন্নভোগ দেওয়া হয়। ভোগের আয়োজন পর্ব চলে রন্ধনশালাতে, রাঁধুনি ঠাকুরেরাই সেসব পরিচালনা করেন। কথিত আছে, পুজোর অষ্টমী তিথিতে নিশিপুজোর সময় নাকি সিঁদুরের থালার মধ্যে মায়ের পায়ের ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। সেই সময়টাতে ঠাকুর দালান ভারী পর্দা দিয়ে আচ্ছাদন করে দেওয়া হয় এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকে।
জানা যায়, এই রাজপরিবারের ইষ্টদেবতা শ্রীরামচন্দ্র। রামচন্দ্র যেমন রাবণ বধের জন্য কৃষ্ণাষ্টমীতে পুজো আরম্ভ করে দশমীতে শেষ করেছিলেন, ঠিক সেই নিয়ম মেনে এখানেও দেবী পুজো হয় ষোড়শী রূপে। অর্থাৎ ১৬ দিন ১৬টি রূপে পুজো হয়। অনেকে একে ষোড়শ পর্বের পুজোও বলেন। এই পুজোর বিশেষত্ব হল দেবী যেহেতু এখানে প্রতিষ্ঠিত, কাজেই বেল্লীবরণ হয় না। রাজবাড়ির পুজো ঘিরে যত কথাই প্রচলিত থাকুক না কেন, মানুষ এই ক’দিন আনন্দের জোয়ারে মেতে থাকেন। রাজবাড়ির সদর দরজা থেকে ঠাকুর দালান প্রাঙ্গন মানুষের জন্য খোলা থাকে। অবাধ যাতায়াত লেগেই থাকে সকাল থেকে সন্ধ্যে।
কথিত আছে মহারাজ জ্যোতি প্রকাশ সিং দেও চীন থেকে রাজমিস্ত্রি এনে এই রাজবাড়ি তৈরি করেছিলেন। কেউ বলেন রাজবাড়ি নির্মাণের জন্য আমেরিকান কারিগর নিযুক্ত করা হয়েছিল। প্রায় ১২ বছর ধরে এই রাজবাড়ির নির্মাণ কাজ চলেছিল। বেলজিয়াম থেকে আনা হয়েছিল বিশাল ঝাড়লণ্ঠন। বেলজিয়ামের আঁকা কাঁচ, বড় ঝাড়বাতি, পাথরের মূর্তি ইত্যাদি রাজপ্রাসাদের রাজকীয়তাকে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছে তা আজও দেখে অবাক হতে হয়। এর সঙ্গে আছে রাজাদের ব্যবহার করা তলোয়ার, বর্শা ও বিভিন্ন অস্ত্র।

Be the first to comment