রমিত সরকার, নদীয়া : সরস্বতী পুজো যত কাছে আসছে, ততই বদলে যাচ্ছে কৃষ্ণনগরের ছবিটা। শহরের অলিগলি জুড়ে এখন একটাই ব্যস্ততা—মা সরস্বতীর প্রতিমার সাজ সময়ের মধ্যে তৈরি করে পাঠাতে হবে। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আলো জ্বলছে সাজশিল্পীদের বাড়িতে। ঘর আর উঠোন মিলিয়ে যেন ছোট ছোট কারখানা। হাতের কাজে গড়ে উঠছে দেবীর অলংকার, আর তার সঙ্গে বয়ে চলেছে শতবর্ষের শিল্প ঐতিহ্য।

কৃষ্ণনগরের সাজশিল্প মানেই ডাকের সাজ আর শোলার কাজ। এই শিল্পের খ্যাতি বহুদিনের, ছড়িয়ে পড়েছে রাজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের নানা প্রান্তে। শোলা, কাগজ, কাপড়, আঠা, চুমকি, সুতো, থার্মোকল—নানা উপকরণ একসঙ্গে মিশে ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে দেবীর সাজে। কারও হাতে শোলার পাপড়ি, কারও হাতে থার্মোকলের নকশা, আবার কেউ ব্যস্ত কাপড় আর অলংকার বসাতে। কাজের চাপ প্রচণ্ড, কিন্তু সেই চাপের মধ্যেই রয়েছে তৃপ্তি—নিজের হাতে তৈরি শিল্পকর্ম দূরে কোথাও পৌঁছে যাবে, এই ভাবনাটাই ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।
শিল্পীদের কথায়, কৃষ্ণনগরে সরস্বতী পুজোর সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। শুধু স্থানীয় পুজো কমিটিই নয়, হাওড়া, কলকাতা, হুগলি, বর্ধমান সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলা এবং রাজ্যের বাইরেও যাচ্ছে সাজের অর্ডার। জগদ্ধাত্রী পুজো শেষ হতেই শুরু হয়ে যায় সরস্বতী পুজোর প্রস্তুতি। সময় কম, কাজ বেশি—এই কয়েক সপ্তাহই বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়।
এ বছর সাজে নতুনত্বের চাহিদা আরও স্পষ্ট। অনেক পুজো কমিটি থিমের সঙ্গে মানানসই বিশেষ সাজ চাইছেন। ফলে শিল্পীদের নকশা তৈরির পাশাপাশি রং, অলংকার আর সামগ্রিক গঠনের দিকেও বাড়তি নজর দিতে হচ্ছে। কাঁচামালের দাম বেড়েছে, তাই সাজের খরচও কিছুটা বাড়ছে। তবু শোলার আর ডাকের সাজের চাহিদায় ভাটা পড়েনি। ছোট সাজের দাম শুরু হচ্ছে প্রায় ৫০০ টাকা থেকে, আর বড় ও বিশেষ নকশার সাজের দাম পৌঁছচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায়।

প্রবীণ শোলাশিল্পী প্রফুল্ল বাগচীর কথায়, “এই শিল্পে ধৈর্যটাই সবচেয়ে বড় জিনিস। একেকটা সাজ বানাতে অনেক সময় লাগে। কৃষ্ণনগরের নাম অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক অর্ডার ইতিমধ্যেই পাঠিয়ে দিয়েছি, বাকিগুলোও সময়ের মধ্যেই চলে যাবে।”
অন্য সাজশিল্পী কার্তিক সরকার জানান, “এ বছর শুরু থেকেই অর্ডার ভালো। সময়ের অভাবে সব কাজ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ডাকের সাজের পাশাপাশি থার্মোকলের সাজেরও চাহিদা বেড়েছে। বাইরে থেকে এত অর্ডার আসা আমাদের শিল্পের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
সরস্বতী পুজোকে ঘিরে কৃষ্ণনগরের এই সাজশিল্প শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ। শোলার প্রতিটি পাপড়ি, ডাকের প্রতিটি নকশার ভেতর লুকিয়ে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রম, ধৈর্য আর সৃজনশীলতা। পুজোর আলোয় সেই শিল্পই আবার নতুন করে প্রাণ পায়, আর কৃষ্ণনগর ফিরে পায় তার চিরচেনা কর্মচঞ্চল রূপ।

Be the first to comment