নারী ও সমাজচেতনার মঞ্চে কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো

Spread the love

নিজস্ব সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর:

কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো এ বছর যেন উৎসবের সীমা ছাড়িয়ে সমাজচিন্তার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। শহরের একাধিক পুজো কমিটি এবারে আলোর চাকচিক্য কিংবা প্রতিমার শৌর্য নয়, বরং সমাজের অন্তর্লীন সত্য ও নারীজীবনের বাস্তব লড়াইকে থিম হিসেবে বেছে নিয়েছে। নারী ও শিশু—এই দুই সত্তাকেই ঘিরে আবর্তিত হয়েছে অধিকাংশ মণ্ডপের ভাবনা। মূল বার্তা একটাই—নারী কেবল দেবী নন, তিনি সংগ্রাম, প্রতিবাদ এবং মানবতার প্রতীক।

“চাই না হতে উমা” — প্রতিবাদের ভাষায় ঘূর্ণি নবারুণ সংঘ
ঘূর্ণি নবারুণ সংঘের এবারের থিমের নামই যেন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় সমাজের দিকে—“চাই না হতে উমা”। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য শুধুই শিল্প প্রদর্শন নয়, বরং সমাজের এক কালো বাস্তব তুলে ধরা। নারী ও শিশু কন্যা পাচার, নির্যাতন, অবমাননা—এই অন্ধকার দিকগুলোকে শিল্পের ছোঁয়ায় মণ্ডপে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বাইরে বনেদি বাড়ির চাকচিক্য, অথচ ভিতরে পৈশাচিকতার ছায়া—এই বৈপরীত্যই মণ্ডপের মর্মবাণী। জানলার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় দেবীর প্রতিমা—যেন খাঁচাবন্দি নারীসত্তা।

মণ্ডপে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে চারটি ঘূর্ণায়মান শিশুকন্যার মূর্তি, প্রতীকীভাবে যারা সমাজের মূল চালিকাশক্তি নারীকে উপস্থাপন করছে। উদ্যোক্তা শুভদ্বীপ বিশ্বাস বলেন, “আমরা চেয়েছি মানুষ ভাবুক—যদি এইভাবে সমাজ চলতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে কন্যা সন্তানকে গ্রহণ করবে কে?”

এই থিমের গভীরতা আরও বাড়িয়েছে এক বিশেষ মুহূর্ত। রানাঘাটের ছোট্ট অস্মিকা, যে এসএমএ নামক এক বিরল রোগের বিরুদ্ধে লড়ছে, তাকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। উদ্যোক্তারা তাঁকে দেখছেন নারীশক্তির জীবন্ত প্রতীক হিসেবে। শুভদ্বীপের কথায়, “এই শিশুর সাহসই আসল বার্তা—নারীর শক্তি কোনও প্রতীক নয়, তা বাস্তব।”

বাঘাডাঙ্গা বারোয়ারির থিম: ‘নারীশক্তি’— দেবী মানে প্রতিটি নারী
অন্যদিকে, কৃষ্ণনগরের ঐতিহ্যবাহী বাঘাডাঙ্গা বারোয়ারি এবারে নারীকে দেখেছে শক্তির প্রতিমূর্তি হিসেবে। মণ্ডপের প্রতিটি কোণে ফুটে উঠেছে নারীর সংগ্রাম, সাফল্য ও আত্মমর্যাদার গল্প। বাঁশ, কাপড় ও আলোর সৃজনশৈলীতে তৈরি মণ্ডপ যেন এক প্রতীকী আয়না, যেখানে দেবী জগদ্ধাত্রী কেবল আরাধ্যা নন, তিনি প্রতিটি নারীর রূপ—মা, যোদ্ধা, কর্মী, প্রেমিকা ও স্রষ্টা।

উদ্যোক্তা সুমিত ঘোষের কথায়, “দেবীকে মণ্ডপে নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শ্রদ্ধা করতে হবে। দেবীর শক্তিকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করাই এই থিমের আসল উদ্দেশ্য।” প্রতিমার চোখে একসাথে মমতা ও প্রতিবাদের আগুন—যা যেন সমাজকে নতুন দৃষ্টিতে নারীর মর্যাদা ভাবতে বাধ্য করে।

চকেরপাড়া বারোয়ারির থিম: বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর
অন্য এক দিক থেকে, চকেরপাড়া বারোয়ারির মণ্ডপ সমাজের এক গভীর ক্ষতের প্রতিবাদে গড়ে উঠেছে। তাঁদের থিম—বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। রাজস্থানের প্রেক্ষাপটে সাজানো মণ্ডপে উঠে এসেছে সেই নির্মম বাস্তবতা, যেখানে অকাল বয়সেই কন্যারা হারিয়ে ফেলে শৈশব, শিক্ষা ও স্বপ্ন। এই শিল্পপ্রয়াস যেন সমাজকে প্রশ্ন করে—এখনও কি আমরা সত্যিই সভ্য?

সমাজচেতনার শহর কৃষ্ণনগর
সব মিলিয়ে, কৃষ্ণনগরের এবারের জগদ্ধাত্রী পুজো শুধুই উৎসব নয়, এটি এক সামাজিক আন্দোলনের ভাষা। প্রতিটি মণ্ডপ যেন এক একটি বার্তা বহন করছে—নারী কেবল পূজার প্রতীক নন, তিনি সমাজের চালিকা শক্তি, প্রেরণা ও আশার উৎস।

দর্শনার্থীদের চোখে এবারের কৃষ্ণনগর তাই শুধু আলোকসজ্জার শহর নয়, বরং এক চিন্তার শহর—যেখানে দেবীর আরাধনা মানে সমাজের আত্মসমালোচনা।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*