প্রণব মুখার্জি; ‘ভারতরত্ন’ এক দূরদর্শী রাষ্ট্রনেতার প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধার্ঘ্য

Spread the love

​২০২০ সালের ৩১শে আগস্ট ভারতের রাজনৈতিক আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র চিরতরে নিভে যায়। দেশের ১৩তম রাষ্ট্রপতি এবং প্রবীণ কংগ্রেস নেতা প্রণব মুখার্জি ৮৪ বছর বয়সে প্রয়াত হন। তাঁর প্রয়াণ কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি ছিল না, বরং তা ছিল দেশের এক অপূরণীয় ক্ষতি। ভারতের রাজনীতিতে এমন এক ব্যক্তিত্বের প্রয়াণ ঘটেছিল, যিনি দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে দেশের সেবা করে গেছেন এবং যাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতা ছিল তুলনাহীন।

​প্রণব মুখার্জির জীবন ছিল সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের এক অনন্য উদাহরণ। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি তাঁর কঠোর পরিশ্রম, গভীর জ্ঞান এবং অতুলনীয় নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতের সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছিলেন। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং ১৯৬৯ সালে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। এরপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

​ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, পি ভি নরসিংহ রাও এবং মনমোহন সিং- এই চার প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভায় তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন দেশের অর্থমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, বিদেশমন্ত্রী এবং বাণিজ্যমন্ত্রী। প্রতিটি দায়িত্বই তিনি দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন। বিশেষত, অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সময়কাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দেশের অর্থনৈতিক সংস্কারে তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তিনি এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি দলের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থকে সবসময় প্রাধান্য দিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে বিরোধী দলের নেতারাও তাঁর প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার প্রশংসা করেছেন।

​প্রণব মুখার্জিকে প্রায়ই ‘রাজনৈতিক সংকটমোচনকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হতো। যেকোনো রাজনৈতিক জটিলতা বা সংকট নিরসনে তাঁর পরামর্শ ছিল অপরিহার্য। তিনি ছিলেন সংবিধানের একজন প্রকৃত অভিভাবক। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি সর্বদা সাংবিধানিক মর্যাদা রক্ষা করেছেন এবং দেশের আইনের শাসনকে সমুন্নত রেখেছেন। রাষ্ট্রপতি ভবনে তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদ ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল ও তাৎপর্যপূর্ণ। বহু গুরুত্বপূর্ণ বিল ও সিদ্ধান্ত তাঁর স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে আইনে পরিণত হয়েছে।

​প্রণব মুখার্জির পাণ্ডিত্য ছিল কিংবদন্তীতুল্য। রাজনীতি ছাড়াও ইতিহাস, অর্থনীতি, সাহিত্য ও ধর্ম বিষয়ে তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল। তিনি একজন অসাধারণ বক্তা ছিলেন এবং তাঁর বক্তৃতা ছিল তথ্যবহুল ও জ্ঞানগর্ভ। তাঁর লেখা বইগুলো আজও গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য মূল্যবান সম্পদ। ২০১৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান, ‘ভারতরত্ন’-এ ভূষিত করে, যা তাঁর দীর্ঘ ও গৌরবময় জীবনের এক যথার্থ স্বীকৃতি।

​প্রণব মুখার্জির মৃত্যু ভারতের রাজনীতিতে এক শূন্যস্থান তৈরি করেছে, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তিনি এমন একজন নেতা ছিলেন, যিনি আদর্শ ও মূল্যবোধের রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। আজকের দিনে যখন রাজনৈতিক আদর্শ প্রায়শই হারিয়ে যাচ্ছে, তখন প্রণব মুখার্জির জীবন ও কর্ম আমাদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর স্মৃতি চিরকাল আমাদের হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকবে। তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন রাষ্ট্রনায়ক, একজন শিক্ষক এবং একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক। তাঁর জীবন থেকে শেখার আছে অনেক কিছু, যা নতুন প্রজন্মকে দেশ গঠনে উদ্বুদ্ধ করবে।

প্রয়াণ দিবসে গভীর শ্রদ্ধা।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*