রবীন্দ্রনাথও বিজেপির বাংলা ও বাঙালির ভাষা-সংস্কৃতি আক্রমণের শিকার হলেন

Spread the love

তপন মল্লিক চৌধুরী : 
শাসক ব্রিটিশ কি কখনও রবীন্দ্রনাথের বাংলা বই বা গান নিষিদ্ধ করেছিল? রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’র মূল প্রকাশনা নিষিদ্ধ করেনি, তবে বইটির অংশবিশেষ এবং তার উপর সমালোচনামূলক লেখা ‘সর্বহারার দৃষ্টিতে রাশিয়ার চিঠি’ (১৯৩৬) নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ১৯৩৪ সালে ‘মর্ডান রিভিউ’-তে ‘রাশিয়ার চিঠি’র একটি অংশ প্রকাশিত হওয়ার পর ব্রিটিশ শাসক ওটির অনূদিত অংশগুলির প্রকাশও নিষিদ্ধ করে। রবীন্দ্রনাথের বই নিষিদ্ধ করতে ব্রিটিশ শাসক ভয় পেত, কারণ তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা মানুষের মধ্যে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে তা ব্রিটিশ শাসক ভাল করে জানতো। তবে রবীন্দ্রনাথের উপর ব্রিটিশ পুলিশ কড়া নজর রাখতো। যৌবনের সূচনা থেকে পুলিশের গোপন খাতায় রবীন্দ্রনাথের নাম ছিল। তাঁর গতিবিধি ও কার্যকলাপের উপর পুলিশের ভীষনরকম নজরদারি ছিল। এমনকী তার বিদেশী ডাকের চিঠিপত্র সেনসরড করা হত। শান্তিনিকেতনে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার বিষয়টাও ইংরেজের দৃষ্টিতে ছিল বিপজ্জনক। ১৯১২ সালের জানুয়ারিতে ব্রিটিশ শাসক কার্লাইল ও রিজলি সার্কুলার নামে একটি গোপন সার্কুলার জারি করে। সার্কুলারে নির্দেশ দেওয়া হয়- সরকারি চাকুরিজীবীর ছেলেমেয়েরা যেন সেখানে পড়তে না যায়। সেই সার্কুলারের দু-বছর আগে ‘হুংকার’(রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গীকৃত কাব্য) কাব্যগ্রন্থের লেখক ও রাজদ্রোহের কারণে জেল খাটা হীরালাল সেনকে শান্তিনিকেতনে চাকরি দেওয়ার জন্য কবিকে আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছিল এবং হীরালালকে আশ্রম ত্যাগ করতে হয়েছিল। ওই ঘটনার জেরে বিপ্লবী ভূপেন্দ্রনাথ দত্তকে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে আশ্রয় দিতে সাহস পাননি। পাকিস্তানের আয়ুব সরকার ১৯৬১ থেকে ৭১ রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করেছিল। সে বছর রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর সময়ে আইয়ুব সরকার পূর্ব পাকিস্তানে যাতে কোন রকম রবোন্দ্রনাথের রচনা নিয়ে যাতে কোনো অনুষ্টানের আয়োজন না হয় তাঁর জন্য বিশেষ তৎপর ছিল। এরপর গত দুদিন আগে আসামের শ্রীভূমি জেলায় কংগ্রেস কার্যালয়ে সেবাদলের অনুষ্ঠানে বিধুভূষণ দাস নামে এক প্রবীণ কংগ্রেস কর্মী রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি গাওয়ায় সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা আসাম পুলিশকে সে রাজ্যের কংগ্রেস কর্মীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর, গ্রেফতার, এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
শাসক নানা কারণেই আইন বা নানা নির্দেশ দেয় শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে। ধর্ম কিন্তু ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকের আইন বা নির্দেশের উদ্দেশ্য ছিল শাসনভার নিরঙ্কুশ করা এবং যা থেকে জনবিদ্রোহ হতে পারে তা দমন করা। আর সেই কারণেই শাসনকে এমন রূপ দিত যাতে জনসমাজে ভয়ের সংস্কৃতি কায়েম হয়। যদিও ব্রিটিশ শাসক ভয়ের সংস্কৃতি কায়েম করলেও স্বাধীনতাপ্রত্যাশী জনগণ, লেখক ও শিল্পীরা তাতে দমে যেতেন না। থেমে যায়নি লড়াই, লেখনী, প্রকাশনা ও নাটক প্রযোজনা। উল্লেখ্য, কাজী নজরুল ইসলামের বই ও সম্পাদিত পত্রিকাই ব্রিটিশ আমলে সবচেয়ে বেশি নিষিদ্ধ হয়েছিল। নজরুল বাংলা সাহিত্য দুনিয়ায় ‘বিদ্রোহী’ বলে পরিচিত। ব্রিটিশ আমলে রবীন্দ্রনাথের কোনো বই নিষিদ্ধ না হলেও তাঁর সাহিত্য নিয়ে বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় রচিত সমালোচনাগ্রন্থ বিদ্রোহী রবীন্দ্রনাথ বাজেয়াপ্ত হয়েছিল ১৯৩১-এর জরুরি ভারতীয় প্রেস অর্ডিন্যান্স ২৩ অনুসারে। বইটি বাজেয়াপ্ত হয়েছিল ১৯৩২ সালের ১৫ এপ্রিল। এটির প্রকাশক ছিলেন রমণীমোহন গোস্বামী আর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কলকাতার হরিঘোষ স্ট্রিটের নবসাহিত্য ভবন। আসামে মুখ্যমন্ত্রী ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়ায় যে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ মামলার নির্দেশ নিয়েছেন সেটি রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের আনা ‘বঙ্গভঙ্গ’ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। বিজেপির পক্ষ থেকে কংগ্রেসকে ‘বাংলাদেশের মোহে আচ্ছন্ন’ বলে আক্রমণ করা হয়েছে। গানটি কেবল বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত নয়, এই গানের পরতে পরতে রয়েছে আবহমান বাংলার প্রতি রবীন্দ্রনাথের অনাবিল ভালোবাসা।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত আসামে পরিবেশন করা কিছুতেই মেনে নেওয়া যাবে না। বিজেপি বলছে, এই গানটি গাইলে নাকি তা ‘ভারত-বিরোধী’ কাজ! এই কথা যতখানি দেশপ্রেমিক রবীন্দ্রনাথকে অপমান ততটাই ভারত বিরোধীতা, দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস তো বিজেপি অস্বীকার করে কারণ, আরএসএস মনেপ্রাণে ব্রিটিশকেই সমর্থন করেছিল, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনেও তাদের একজনও কেউ অংশ নেয়নি। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের আনা ‘বঙ্গভঙ্গ’ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে যখন ‘স্বদেশী আন্দোলন’ চলছিল, তখন রবীন্দ্রনাথ এই গানটি রচনা করেছিলেন, গানটি ব্রিটিশ বিরোধী ‘স্বদেশী আন্দোলন’-এ এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছিল। সেই ইতিহাসকে বিজেপি যে কতটা অসম্মান-অপমান করে তার প্রমাণ বিজেপি আরও একবার জানিয়ে দিল। বিজেপি জানাচ্ছে, স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠিত হবার পর বাংলাদেশ তাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে এই গানটিকে গ্রহণ করে। সুতরাং এই গানটি কেবল বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত, এটিই গানটির একমাত্র পরিচয়। এ কথা সম্পূর্ণতই মূর্খামি কারণ এই গানটি যুগে যুগে দেশকালের বেড়া ভেঙে আপামর বাঙালির প্রাণের গান। এই গান গাইলে সে ভারত-বিরোধীতা নয়, বিজেপি-আরএসএস-এর ইতিহাস বিকৃতি এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উপর আক্রমন। বিজেপি-আরএসএস সম্মিলিতভাবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে ধ্বংস করতে চাইছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তির চক্ষুশূল। যা বিজেপির নীতি ও আদর্শের বিরোধী।
এই বিজেপি সরকার ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের বাংলাভাষী অধ্যুষিত করিমগঞ্জ জেলার নাম পরিবর্তন করে রেখেছে শ্রীভূমি। আসামের বরাক নদের অববাহিকায় যে জেলায় বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা বেশি, সেই তিনটি জেলার একটি করিমগঞ্জ। সেই জেলার নতুন নামকরণ প্রসঙ্গে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাই বলেছিলেন, শতাধিক বছর আগে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক করিমগঞ্জ জেলা অঞ্চলকে শ্রীভূমি অর্থাৎ, মা লক্ষ্মীর ভূমি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান জানাতে এবং এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করতেই নতুন নামকরণ। আর আজ সেই রবীন্দ্রনাথকেই অসম্মান এবং অপমান। বিজেপির এই আক্রমণে আসলে গোটা বিষয়টির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে উপেক্ষা করা। তাছাড়া বাংলা ভাষা ও বাঙালিদের উপর যে ধরণের বিদ্বেষ, বিজেপিশাসিত রাজ্যে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর আক্রমণ, বাংলায় কথা বলার অভিযোগে বাংলাদেশি দাগিয়ে জেলবন্দি করা, তাতে আরও স্পষ্ট হল যে বাংলা, বাঙালি, বাংলা ভাষার উপর বিজেপি আক্রমণ হানছে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*