নদীয়া, নিজস্ব সংবাদদাতা :
নদীয়া জেলার তাহেরপুরে শুক্রবার কার্যত জনসমুদ্রে রূপ নিল তৃণমূল কংগ্রেসের জনসভা। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাকে ঘিরে সকাল থেকেই কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ছিল চোখে পড়ার মতো উদ্দীপনা। ধীরে ধীরে তাহেরপুরের নেতাজি পার্ক ময়দান ঘিরে জমতে থাকে মানুষের ঢল। বিভিন্ন সংগঠনিক এলাকা থেকে লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে সভাস্থল ছিল কানায় কানায় ভরা।
সভামঞ্চে উপস্থিত ছিলেন নদীয়া জেলার মন্ত্রী থেকে শুরু করে দলের একাধিক শীর্ষ নেতৃত্ব। গোটা এলাকা জুড়ে ছিল আঁটোসাঁটো নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বেলা দু’টো পনেরো নাগাদ সভাস্থলে পৌঁছে মঞ্চে ওঠেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শুরুতেই আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়ান তিনি।
এসআইআর (Special Intensive Revision) প্রসঙ্গে অভিষেকের কটাক্ষ ছিল তীব্র। তাঁর হুঙ্কার,
“আমরা অবৈধ, আর নরেন্দ্র মোদী বৈধ!”
তাহেরপুরের সভা থেকেই মতুয়া সম্প্রদায়ের আবেগের প্রসঙ্গ টেনে আনেন তিনি। ভোটার তালিকা থেকে লক্ষ লক্ষ নাম বাদ পড়ার অভিযোগ তুলে নিশানা করেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা শান্তনু ঠাকুরকে। প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন— “মতুয়ারা অবৈধ আর শান্তনু ঠাকুর বৈধ?”
একদিকে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া, অন্যদিকে ইডি লাগিয়ে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ— বিজেপি সরকারের কাজের ধরন এভাবেই ব্যাখ্যা করেন অভিষেক। তাঁর স্পষ্ট বার্তা,
“কিছু লাগিয়ে কিছু হবে না। শেষ কথা বলবে মানুষ।”
তিনি দাবি তোলেন— হয় নিঃশর্ত নাগরিকত্ব দিতে হবে, নাহলে মোদী-অমিত শাহকে গদি ছাড়তে হবে।
এসআইআর-এর লাইনে দাঁড়িয়ে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে গিয়ে বয়স্ক ও অশক্ত মানুষদের হয়রানির ছবিও তুলে ধরেন তিনি। মঞ্চের র্যাম্পে তিন জন প্রবীণ মানুষকে তুলে এনে অভিষেক বলেন,
“আপনারা এঁদের দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু জ্ঞানেশ কুমার দেখতে পাচ্ছেন না। অমিত শাহ কিন্তু দেখতে পাচ্ছেন।”
তাঁর অভিযোগ, বহু জীবিত মানুষকে ‘মৃত’ দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
বাংলার আবেগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখে ‘বঙ্কিমদা’ সম্বোধনের কথাও উল্লেখ করেন। রানাঘাটের বিজেপি সাংসদ জগন্নাথ সরকারের মন্তব্য উদ্ধৃত করে অভিষেক বলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের ফারাক ঘুচিয়ে দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে— যা বাংলার মানুষের কাছে বিপজ্জনক ইঙ্গিত।

আই-প্যাক প্রসঙ্গে অভিষেক বলেন, তৃণমূলের হয়ে ওই সংস্থা ‘দিদির দূত’ অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে এসআইআর সংক্রান্ত সহায়তা করছে বলেই বিজেপি ইডিকে ব্যবহার করে তাদের হেনস্থা করছে। তাঁর বক্তব্য,
“এদের দশ গোল দিতে হবে। ভোটের বাক্স খুললেই তার জবাব মিলবে।”
সভামঞ্চ থেকেই ওঠে স্লোগান— “যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা”। সঙ্গে দৃপ্ত ঘোষণা, “আমাদের মেরুদণ্ড ফর সেল নয়।”

শেষে নদীয়া জেলার ১৭টি বিধানসভা কেন্দ্রেই জয়ের লক্ষ্য স্থির করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আহ্বান জানান— যারা আগে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন, তাঁরা যেন এবার তৃণমূলের ওপর ভরসা রাখেন। তাঁর স্পষ্ট বার্তা,
“নদিয়ায় ১৭–০ করে দেখাতে হবে।”
তাহেরপুরের এই জনসভা যে আসন্ন রাজনৈতিক লড়াইয়ের সুর আরও চড়াল, তা বলাই বাহুল্য।

Be the first to comment