রোজদিন ডেস্ক, কলকাতা:- বিজেপির কর্মিসভা ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়াল ৷ রবিবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজ্য প্রশাসন ও শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তোলেন ৷ পয়েন্ট ধরে ধরে পাল্টা জবাব দিল তৃণমূল।
রবিবার নেতাজি ইন্ডোর থেকে অমিত শাহ বলেন, ‘দিদি, আমি আপনাকে চ্যালেঞ্জ করছি-অরাজকতা ছাড়া ভোট করুন, তাহলে আপনার জামানত বাজেয়াপ্ত হবে’। এর জবাবে তৃণমূল জানায়, ভোট হয় কেন্দ্রীয় বাহিনীর নজরদারিতে। অমিত শাহ ওই দফতরের প্রধান। আমরা বরাবরই জানতাম উনি অযোগ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আজ তিনি নিজেই সেটা স্বীকার করে নিলেন।
রবিবার বাংলয় এসে অপারেশন সিঁদুর নিয়ে ‘শাহ’ বলেন দিদি, আপনি মোদীজির বক্তৃতার পর অপারেশন সিঁদুরকে অপমান করেছেন’। এরপরই তৃণমূল জবাব দেয়, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্টভাবে বলেছেন-দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং অপারেশন সিঁদুরে তাঁদের বীরত্বের পাশে আমরা আছি। একাধিকবার-তাঁর সর্বশেষ সাংবাদিক বৈঠকেও-তিনি সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। যেটা প্রধান সেবক করেনি। তৃণমূল নয়, বিজেপি নেতারাই অপারেশন সিঁদুরকে নিয়ে ব্যঙ্গ করেছে। অমিত শাহ আজ যে তৃণমূলকে আক্রমণ করলেন, সেই তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আজও ভারতের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, পাকিস্তানের মুখোশ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে খুলে দিচ্ছেন, কাশ্মীরে শান্তি ও পর্যটন ফিরিয়ে আনার আবেদন জানাচ্ছেন।
বাংলায় অনুপ্রবেশ চলছে বলেও হুশিয়ারি দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, তৃণমূল কি থামাতে পারবে? জমি দিন, বেড়া দেব, পাখিও ঢুকতে পারবে না ভারতে। জবাবে তৃণমূল বলে, যদি শুধু জমি হলেই অনুপ্রবেশ থেমে যায়, তাহলে পহেলগাঁওতে জঙ্গিরা কীভাবে ঢুকে ২৬ জনকে নৃশংসভাবে খুন করল? জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ আর বিএসএফ, দু’টোই অমিত শাহ’র অধীন। তাহলে গোয়েন্দা ব্যর্থতার দায় কার? আর বড় কথা হল-জবাবদিহি কোথায়? সত্যি হল, অমিত শাহ একজন অযোগ্য ও নির্লজ্জ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যিনি দেশের প্রতিটি নাগরিককে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। ওনার ইস্তফা দেওয়া উচিত।
ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে রবিবার কর্মীসভায় অমিত শাহ বলেন, আমরা বাংলায় ভোট শেয়ার বাড়িয়েছি, ২০২৬-এ সরকার গড়ব। পাল্টা রাজ্যের শাসকদল জানানয়, ২০২১ সাল থেকে একই ক্যাসেট চালাচ্ছে বিজেপি। তাদের মিথ্যে দাবিগুলো বাংলাতেই নয়, অন্য রাজ্যেও মুখ থুবড়ে পড়েছে। যারা শেষ লোকসভা ভোটে ৬০ আসন হারিয়েছে, দুই দলের ভরসায় সরকারে টিকে আছে, তারা নিজেদের কর্মীদের মনোবল বাড়াতে যে এমন গল্প ফাঁদবে, সেটাই স্বাভাবিক। বিজেপি বাংলাকে জোর করে দখল করতে চায়। কিন্তু ২০২১-এ ভোট না পাওয়ায় বাংলার মানুষকে যেভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তার জবাব বাংলার মানুষ ২০২৬-এ ঠিক দেবে।
এরপর, কয়লা দুর্নীতি, থেকে গরু পাচার একাধিক সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে মমতার সরকারকে এক হাত নেন ‘শাহ’। এরপরই ঘাসফুল শিবির ‘শাহ’কে তীব্র কটাক্ষ করে বলে, সীমান্ত কার হাতে? কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের। তাহলে গরু পাচার হচ্ছে কীভাবে? কয়লা কার অধীনে? CISF! তাহলে এত কিছু ঘটছে কাদের চোখের সামনে? গত বছর নির্বাচনের সময় অন্ডাল বিমানবন্দরে কয়লা মাফিয়া জয়দেব খানের সঙ্গে দেখা করলেন অমিত শাহ। কীসের আলোচনা হয়েছিল? শুধু উনিই নন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশীও বাংলায় কয়লা মাফিয়াদের সঙ্গে দেখা করেছেন। তারপরও অমিত শাহ কয়লা দুর্নীতি নিয়ে ভাষণ দেন! মিডিয়া ট্রায়াল বন্ধ করুন, কঠিন সত্যের মুখোমুখি হন।
রবিবার তোষণ আর পূজার শোভাযাত্রা বন্ধ নিয়ে তৃণমূলকে কটাক্ষ করে অমিত শাহ। পাল্টা তৃণমুল বলে, বিজেপির গোটা কাঠামোটাই মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে। অমিত শাহ সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী-এটা বাংলার মানুষ জানে। আমাদের দুর্গাপুজো হয় আনন্দের সঙ্গে। শুধু দুর্গাপুজো নয়, সমস্ত উৎসব মিলেমিশে পালিত হয়, কারণ আমরা ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যে’ বিশ্বাস করি। আজ বিজেপি বলেছে, দুর্গাপুজোর শোভাযাত্রা থামানো হয়েছে। ভুলে গেছেন? মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগেই দুর্গাপুজো পেয়েছে ইউনেসকো (UNESCO)-র হেরিটেজ ট্যাগ। আপনি বাংলার দুর্গাপুজো নিয়ে মিথ্যে বলে শুধু বাংলাকে অপমান করেননি, গোটা বিশ্বে বাংলার বদনাম করেছেন।
রবিবার কর্মীসভা থেকে সন্দেশখালি, আরজিকরের ঘটনাকে সামনে এনে ‘মহিলা মুখ্যমন্ত্রী’ বলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র সমালোচনা করেন ‘শাহ’। এরপরই রাজ্যের শাসকদলের তরফ থেকে বলা হয়, সন্দেশখালিতে মহিলাদের দিয়ে খালি কাগজে সই করিয়ে নিয়েছে আপনার দলের নেতারাই-এর মধ্যে একজন বর্তমান সাংসদ রেখা শর্মা। ভোটের জন্য এই ষড়যন্ত্র করেও বাংলার মহিলারা আপনাদের জবাব দিয়েছেন। তার উত্তর কই? আর জি করে, কলকাতা পুলিশ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তকে ধরেছে। মামলা এখন সিবিআইয়ের হাতে, কিন্তু আজও তারা কোনও বিচার দিতে পারেনি-যেমন অন্য বহু ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ।
তৃণমূলের দাবি ছিল দোষীর ফাঁসি-এবং আমরা “অপরাজিতা আইন” এনেছি। আপনি কি বিজেপি-শাসিত রাজ্যের ঘটনাগুলো দেখেন না? আমরা দোষীদের শাস্তি দিই, বিজেপি পুরস্কার দেয়! প্রজ্বল রেভান্না, কর্ণাটকের বিধায়ক মুনীরা ও তার দলবলের নারী নিগ্রহ, মহিলার গায়ে প্রস্রাব-এইসব ঘটনায় অমিত শাহ কোথায় ছিলেন? সম্প্রতি বিজেপির মহিলা মোর্চা নেত্রীর ছেলে শুভম গুপ্তার পর্ন ভিডিও কাণ্ড প্রকাশ্যে এসেছে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? এনসিআরবি-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০, ২০২১ ও ২০২২-এই তিন বছর ধরে কলকাতা ভারতের সবচেয়ে নিরাপদ শহর হিসাবে ঘোষিত হয়েছে।
তৃণমুল একাধিকবার কেন্দ্রের বঞ্চনার বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের একবছর আগে বাংলায় এসে দলীয় কর্মিসভা থেকে ‘শাহ’ জানান কেন্দ্রীয় সরকর বাংলাকে ৮ কোটি ২৭ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে, তিনি আরও জানান, সমস্ত তথ্য দেবে বিজেপি। এরপরই তৃণমূলের তরফ থেকে জানানো হয়, তাহলে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে বাংলাকে দেওয়া টাকার শ্বেতপত্র প্রকাশ করুন। বিশেষত, ২০২১ ভোটের পর বাংলা থেকে আবাস ও মনরেগা (MGNREGA)-র টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। আমাদের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক বহুবার এই দাবী তুলেছেন। এখনও বাংলার প্রাপ্য ১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা কেন্দ্র দেয়নি। বিজেপি বাঙালিদের এত ঘৃণা করে কেন? শুধু তারা আপনাদের ভোট দেয়নি বলে? ২০২৬-এ আবার চরম জবাব পেতে চলেছে বিজেপি।

Be the first to comment