কৃষ্ণনগরের নজিরাপাড়ায় চট্টোপাধ্যায় বাড়ি মানেই এক আলাদা চেনা গন্ধ—নীল দুর্গার গন্ধ। প্রায় সাড়ে তিনশো বছর ধরে এ বাড়ির দুর্গাপুজো আজও একইভাবে চলছে। সময় পাল্টেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু বিজয়ার দুপুরে পান্তা ভাত, কচুর শাক, ডালের বড়া আর গন্ধরাজ লেবুর গন্ধ আজও মিশে থাকে আঙিনায়। এ ভোজ বিলাসিতার নয়, এ ভোজ আবেগের, মাটির গন্ধে ভরা এক অটুট ঐতিহ্যের।

নীল দেবীর আবির্ভাব
এই বাড়ির দুর্গা নীলবর্ণা। অনন্য, বিরল। পরিবার বলে, প্রথমে প্রতিমা ছিল গাঢ় রঙের। এক রাতে এক বৃদ্ধ কারিগর হারিকেনের আলোয় রঙ করছিলেন। ভোরে দেখা গেল—দেবী নীল রঙে রূপ নিয়েছেন! তখনই চিন্তাহরণ চট্টোপাধ্যায় ঘোষণা করেন, দেবী তাঁকে স্বপ্নে আদেশ দিয়েছেন নীলবর্ণেই পূজা করার। সেই থেকে দুর্গা এখানে কেবল নীল, অন্য কারও রঙ পাল্টায় না। নীলের মধ্যেই এই বাড়ির পূজার আত্মা লুকিয়ে আছে।

প্রথা ও রীতি
প্রতিমা এখানে একতলা, কার্তিক-গণেশের আসনও আলাদা, যেন বাংলাদেশি পূজার ছোঁয়া মিশে আছে। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত চলে বলির আচার—পাঁঠার সঙ্গে আখ, কলা। এককালে মোষ বলির প্রথা ছিল, এখন সেই জায়গায় পূজার আচার্য নিজ রক্ত অর্পণ করেন দেবীর চরণে। ষষ্ঠীতে বাড়ির বেলগাছের পূজা, উল্টো রথে কাঠামোর পূজা—সবকিছু মিলিয়ে শক্তিসাধনার রীতিগুলো আজও জীবন্ত।
ভোগের আবেগ
এই পূজার আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে ভোগে। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে থাকে বিশেষ খাবার, কিন্তু আসল অপেক্ষা থাকে দশমীর দুপুরে। বিদায়ের মুহূর্তে সাদা ধোয়া ভাত নয়, থাকে ভিজে পান্তা। সঙ্গে কচুর শাক, ডালের বড়া আর কেটে রাখা এক টুকরো গন্ধরাজ লেবু। এই সামান্য ভোজই যেন মনে করিয়ে দেয়—ঐতিহ্যের মানে আড়ম্বর নয়, বরং মাটির গন্ধ, নদীর ঢেউ আর বাংলার সাধারণ মানুষের আবেগ।

উত্তরাধিকারের টান
আজও এই নীল দুর্গা বাড়ি শুধু পূজা নয়, কৃষ্ণনগরের প্রাণের অংশ। পাড়ার মানুষ, দূরদূরান্তের অতিথি—সবাই টান অনুভব করেন। বিজয়ার দিনে ভিজে পান্তার সঙ্গে গন্ধরাজের সুবাস মিলিয়ে দেয় অশ্রুসিক্ত বিদায় আর এক অদৃশ্য বন্ধন—যা মানুষকে যুগ যুগ ধরে বেঁধে রেখেছে ঐতিহ্যের সুতোর টানে।


Be the first to comment