নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার ঠিক পরেই নির্বাচন কমিশন একের পর এক প্রশাসনিক পদে আসীন আধিকারিকদের পরিবর্তন করে অন্য রাজ্যের নির্বাচনী পর্যবেক্ষক হিসেবে বা অন্য পদে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। গোট পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য রাতারাতি সেই বদল দেখেছে। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের আবহে নির্বাচন কমিশনের এহেন কীর্তিকলাপে রাজ্যের শান্তি বিঘ্নিত হচ্ছে এবং একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে একটি প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার ও ক্ষমতা দেখানোর মরিয়া চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ অভিযোগ তুলেছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে প্রতিবাদ জানিয়ে রবিবার ২২ মার্চ কলকাতা প্রেস ক্লাবে দেশ বাঁচাও গণমঞ্চের পক্ষে থেকে একটি সাংবাদিক সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছিল। সভায় উপস্থিত ছিলেন দেশ বাঁচাও গণমঞ্চের সভাপতি প্রাক্তন শ্রম ও কৃষি মন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসু, বিশিষ্ট কবি শ্রীজাত, অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকার, বিশিষ্ট চিকিৎসক শান্তিরঞ্জন দাসগুপ্ত, অনন্যা চক্রবর্তী, পরিচালক হরনাথ চক্রবর্তী, বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী সৈকত মিত্র, অভিনেতা রাহুল চক্রবর্তী, বীরেশ চক্রবর্তী, অভিনেত্রী সোমা চক্রবর্তী, ‘ইওরস ভয়েস’-এর সদস্য দেবমাল্য নন্দী, সংখ্যালঘু কমিশনের চেয়ারম্যান ইমরান হাসান আহমেদ, সঙ্গীত শিল্পী অমিত কালী, সমাজসেবী কল্যাণ সেনগুপ্ত, জাতীয় বাংলা সম্মেলনের সভাপতি সিদ্ধব্রত দাস, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের অন্যতম সদস্যা বর্ণালী মুখার্জী, বিশিষ্ট অধ্যাপিকা সৈয়দ তানভীর নাসরীন, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুমন ভট্টাচার্য প্রমুখ এবং ভার্চুয়ালি নিজের বক্তব্য রাখেন কবি জয় গোস্বামী। সমাজসেবী এবং তথ্যচিত্র পরিচালক সুশান রায়ের ‘সার’ বিরোধী একটি শর্ট ফিল্মও দেখানো হয়, যা অত্যন্ত তাৎপর্যমূলক।
কবি শ্রীজাত তাঁর নিজের লেখা কবিতা ‘পথিকের গান’ পাঠ করে এই সাংবাদিক সম্মেলনের সূচনা করেন।
আমরা পথিক। পৃথিবীর ইতিহাসে
আমরা বেঁধেছি নিষ্ফল কিছু গান।
জন্ম জন্ম অপেক্ষাতেই গেছে
আসিবে তরণী, বহি তব সম্মান।
সে-তরণী যদি যুদ্ধের কথা বলে,
আমাদেরই দিকে ঘোরে কামানের মুখ,
অসম হলেও, তাহলে লড়াই হবে।
কলিজা বনাম সারবাঁধা বন্দুক!
কত প্রজন্ম এই দেশে ছিল ভিটে,
প্রশ্নের মুখে আজ তবু পরিচয়…
তোমার নিয়মে লজ্জাবনত দিন,
রোদের সাক্ষ্য দুপুরকে দিতে হয়?
কী হবে, আমার অধিকার কেড়ে নিলে?
ছাই করে দিলে আমার কণ্ঠস্বর?
চেনা কৌশলে, যুদ্ধের ঠিক আগে
সৈন্য বদলি, একঘর, চারঘর…
আমাদের গান স্তব্ধ হবে না তবু।
আমরা লিখব সময়ের আখ্যান,
যুগ থেকে যুগ, ইতিহাস বলে গেছে,
পালকের চেয়ে ভারী না, শিরস্ত্রাণ।
সাহস থাকলে সমানে সমানে খেলো।
প্রতিপক্ষকে সাম্যের দান দাও।
যদি ভেবে থাকো, তাহলে ভেবেছ ভুল।
নাম মুছে গেলে মুছব না আমরাও।
কেউ না বলুক, আয়না তো বলে দেবে
তুমি কোন দলে। ন্যায়, নাকি অন্যায়?
আর কে না জানে, শত অস্ত্রের মুখে
মানুষের হয়ে নিশানই জবাব দেয়।
প্রলয় বন্ধ না রাখলে, মনে রেখো,
অন্ধেরও থাকে নিষ্ক্রিয় দুটো চোখ।
যা কিছু হুকুম, ভালবাসাতেই থাক?
লড়াই কেবল গণতান্ত্রিক হোক।
এবার লড়াই গণতান্ত্রিক হোক!
দেশ বাঁচাও গণমঞ্চের সদস্যরাও নিজেদের বক্তব্য রাখেন। প্রায় সমস্ত সদস্যদেরই অভিযোগ প্রায় একই, ‘সার’ ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই বোঝা গিয়েছিল বিজেপির দ্বারা নির্বাচিত নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা ঠিক কী! কারণ, সংবিধানের নিয়মানুযায়ী কমিশনের দায়িত্ব হল একটি নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করা। কিন্তু সেটা হচ্ছে কোথায়? দেশ বাঁচাও গণমঞ্চের সদস্যরা সংবাদমাধ্যমের সামনে প্রশ্ন তুলেছেন, লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি, বাংলাদেশি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, রোহিঙ্গা আরও নানা অনৈতিক বিষয় খাড়া করে অবৈধ ভোটারদের সঙ্গে বৈধ ভোটারদেরও নাম বাদ করে দেওয়া হচ্ছে। এখনও বহু মানুষের বিচার বিবেচনাধীন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচন হতে হতে হয়তো যৎসামান্য মানুষই ভোটে যোগ দিতে পারবেন, দুই দফায় নির্বাচন ঘোষণা, নির্বাচন ঘোষণার পরই রাজ্যের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে থাকা আধিকারিকদের বদলে দেওয়া, এটাই কি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি? এসব কি রাজ্যের প্রশাসনিক সক্ষমতাকে নড়িয়ে দেবে না?
দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ কিছু সুস্পষ্ট মতামত এবং দাবি রাখে— তা হল, ১) নির্বাচন কমিশনের সমস্ত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের একটি স্বচ্ছ-লিখিত ব্যাখ্যা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে, ২) আধিকারিকদের স্থানান্তরের সুসংহত ও যুক্তিসংগত নীতি অনুসরণ করা হয়েছে কিনা, তা স্পষ্ট করতে হবে, ৩) কেন্দ্র ও রাজ্যের সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষার ব্যাপারে অবিলম্বে সংলাপ শুরু করতে হবে। দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ এর প্রতিবাদে রাস্তায় নামবে
এবং বাঙালির আত্মমর্যাদা রক্ষায় বাঙালিকেও প্রতিবাদ করতে হবে।

Be the first to comment